ক্রিস্টোফি স্যান্ড ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো আলজিয়ার্সে আগমন করেন। তিনি কাসাবাহ শহরের মেঘে ঢাকা আকাশ দেখে কেঁদে ফেললেন। তিনি বলেন, আমি এমন ব্যথা অনুভব করলাম, যা আগে কখনো অনুভব করিনি। এটা আমার কাছে অপরিচিত ছিল।
আমি তখন চিৎকার করতে চাচ্ছিলাম। স্যান্ড আলজেরিয়া থেকে ১১ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত নিউ ক্যালেডোনিয়ায় বেড়ে উঠেছেন। এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ফ্রান্স শাসিত অঞ্চল। জীবনের বড় একটি সময় পর্যন্ত স্যান্ডের কাছে তাঁর পরিবারের ইতিহাস রহস্যজনক মনে হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল তাঁর দাদাকে আসামি হিসেবে আলজেরিয়া থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর দাদিও তাঁকে পরিবার ও আলজেরিয়ান ঐতিহ্য সম্পর্কে বলতে অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর নাম ইয়াসমিনা থেকে পরিবর্তন করে মিনা করেছিলেন। এভাবে তিনি নিজেকে আরব শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন।
ফ্রান্স আলজেরিয়া দখলের ৪০ বছর পর ১৮৭১ সালের জানুয়ারি মাসে কাবেলি জনগোষ্ঠী, যারা ছিল আমাজিগ নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তারা ফরাসি ঔপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আলজেরিয়ার ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ। শেষ পর্যন্ত এতে অংশ নিয়েছিল ২৫০টি গোত্র। তখন ফরাসিরা ধারণার চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করে। তারা হাজারো গ্রাম ধ্বংস করে এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যা করে।
এক বছর যুদ্ধের পর ১৮৭২ সালে প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষ হয়। ফরাসিরা বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্তদের প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে নানা দণ্ডে দণ্ডিত করে। তবে আবার বিদ্রোহ এড়াতে দুই হাজারেরও বেশি নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দূর ভূমিতে নির্বাসন দেয়। নিউ ক্যালেডোনিয়ায় নির্বাসিত হয় বহু আলজেরিয়ান। স্যান্ডের প্রপিতামহ (দাদার বাবা) ছিলেন সেসব নেতার একজন। তিনি শ্রমিক শিবিরে কাজ করতেন। পুরো যাত্রাপথে তাঁরা দ্বিন পালনের মাধমে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। যেমন—তাঁরা সমুদ্রযাত্রার সময় রমজানের রোজা রেখেছিলেন, খাদ্যে হালাল-হারাম মেনে চলেন, শূকর ও মদ পরিহার করেন।
নিউ ক্যালেডোনিয়া শুধু রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসনকেন্দ্র ছিল না, বরং মূল ফরাসি ভূখণ্ডের অপরাধীদেরও নির্বাসিত করা হতো। এখানে ইসলাম চর্চার অনুমতি ছিল না। মুসলিমদের খ্রিস্টান নাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় এবং তাদের নির্বাসিত ফরাসি নারীদের বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। তাদের ধারণা ছিল, এর মাধ্যমে আলজেরিয়ান মুসলিমদের শিকড় ছাড়া করা যাবে। ফল হয়েছে উল্টো। ফরাসি নারীরা আলজেরীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে, আলজেরীয় রান্না শেখে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে তা শিক্ষা দেয়। আলজেরীয় রীতিতে তারা খেজুর গাছ চাষ করে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নারীদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের সন্তানদের আরবীয় মুসলিম নাম রাখে। ১৯৩৬ সালে ফরাসি সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে অনেকেই নিজের মুসলিম নামে আত্মপ্রকাশ করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম ও ঐতিহ্য রক্ষার এই প্রচেষ্টা দুর্বল হয়েছে। তাদের অনেকেই মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভুলে গেছে, ভুলে গেছে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পূর্বপুরুষের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস। বর্তমানে নিউ ক্যালেডোনিয়ায় ১৫ হাজার আলজেরীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। তাদের পারিবারিক ইতিহাস জানে না। ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে ফেলেছে। যেমন স্যান্ডের দাদি বিশ্বাস করতেন তাঁর দাদার বাবা একজন অপরাধী ছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে স্যান্ড জানতে পারেন তিনি একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন। এই সত্য জানার পর তাঁর জীবনটাই পাল্টে যায়।
২০০০ সালে আলজেরিয়ার একদল গবেষক বিদ্রোহী নেতাদের পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করতে নিউ ক্যালেডোনিয়ায় আসে। তারা নির্বাসিতদের ওপর রচিত একটি বই নিয়ে এসেছিল। যেখানে স্যান্ডের প্রপিতামহীর বর্ণনা ছিল। তিনি তাঁর নির্বাসিত ছেলেকে বিদায় জানাতে আলজিয়ার্স বন্দরে এসেছিলেন এবং ফরাসি সেনারা তাঁকে মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় দিয়েছিল। ২০০৪ সালে নির্বাসিত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তথ্যচিত্র (খবং ঃঞ্জসড়রহং ফব ষধ সঞ্জসড়রত্ব) প্রকাশ করা হয়। যেখানে প্রবীণরা তাঁদের না বলা কথাগুলো বলেন এবং তরুণরা তাঁদের শিকড়ের সন্ধান পায়। স্যান্ড এই তথ্যচিত্রে অভিনয় করেছিলেন। স্যান্ড আলজেরিয়ায় তাঁর প্রপিতামহের গ্রাম ভ্রমণ করেছিলেন এবং স্থানীয়রা তাঁকে খেজুর ও ছাগলের দুধ দিয়ে আপ্যায়ন করেছিল। তিনি সেই ঘরও দেখেছিলেন যেখানে তাঁর প্রপিতামহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নিউ ক্যালেডোনিয়ায় বসবাসকারী আলজেরীয়দের অনেকে এখনো নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় সক্রীয়। অনেকেই স্থানীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। আবার কেউ কেউ মিশ্র সংস্কৃতির ধারক। যেমন—স্যান্ড নিজেকে ক্যাথলিক পরিচয় দিলেও রমজান মাসের রোজা পালন করেন।