প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশন), তারপর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউনাইটেড নেশন্স হিউম্যান রাইট্স কাউন্সিল বা ইউএনএইচআরসি)। হোয়াইট হাউসে বসেই দুই আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই তালিকায় এবার কি যুক্ত হতে চলেছে জি২০?
চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা একটি পোস্টে সাফ জানিয়ে দেন, আসন্ন জি২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাচ্ছেন না তিনি। তার ওই পোস্ট প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি নিয়ে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা।
আগামী ২০-২১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে চলবে জি২০-ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা পোস্টে মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওই সম্মেলন বয়কট করছেন তিনি। কারণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী’ মনোভাব এবং পদক্ষেপের কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পোস্টে মার্কো রুবিও লিখেছেন, “জি২০ সম্মেলনের নাম করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করছে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার। এটা কখনওই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।”
এবারের জি২০ বৈঠকের থিম অবশ্য ‘সংহতি, সমতা এবং স্থায়িত্ব’ রেখেছে আফ্রিকার দক্ষিণ বিন্দুর ওই দেশ।
দিন কয়েক আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমি সংস্কার নীতির কড়া সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তাতে আমল দেয়নি কেপটাউন। তাদের যুক্তি ছিল, বর্ণবৈষম্য দূর করতেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ট্রাম্প। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ‘বৈচিত্র, সাম্য এবং অন্তর্ভুক্তি’ নীতির কড়া সমালোচনা শুরু করেন এই বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতা। ফলে মার্কো রুবিওর জি২০ সম্মেলন বয়কটের সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের নীতি নিয়েও আপত্তি রয়েছে আমেরিকার। এক্স হ্যান্ডলে করা পোস্টে তার উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে হাল ছাড়তে নারাজ কেপটাউন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে তারা।
ট্রাম্পের সাফ কথা, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করবেন তিনি। করদাতাদের অর্থ নষ্ট করা বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনও কিছুকেই সমর্থন করতে রাজি নন এই বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতা। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা অবশ্য বলেছেন, “ভূমি সংস্কার নীতির ব্যাখ্যা ওয়াশিংটনের সামনে রাখতে আমরা প্রস্তুত।”
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ধনকুবের শিল্পপতি ইলন মাস্কের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন রামাফোসা। পরে এ নিয়ে বিবৃতি দেয় তার অফিস। সেখানে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমি সংস্কার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল বোঝানো’ হচ্ছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জমির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বর্ণবৈষম্যের অবসানের তিন দশক পরেও দেশটির অধিকাংশ কৃষিজমি রয়েছে শ্বেতাঙ্গদের হাতে। ফলে ভূমি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রামাফোসা সরকার। কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে দেশটির উপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করে চলেছে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ভূমি সংস্কারের কথা বলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর জি২০ সম্মেলন বয়কট আসলে একটি বাহানা। এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কারণ। বন্ধু রাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে দেড় বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে ইহুদি সেনাদের বিরুদ্ধে উঠেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি) দ্বারস্থ হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখান থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।
এই ঘটনায় খোলাখুলিভাবে ইহুদিভূমির পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার কয়েক দিনের মাথাতেই আইসিসির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে।
২০১৭-’২১ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম জামানায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উপর ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তা প্রত্যাহার করে নেন। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণ করে রাশিয়া। এর কয়েক মাসের মধ্যেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি।
পুতিনের বিরুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং ইউক্রেন থেকে হাজার হাজার শিশুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা দায়ের হয়। এর নেপথ্যে ছিল আমেরিকা। কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংস্থাটি একই রকমের পদক্ষেপ করতে গেলে বেঁকে বসে ওয়াশিংটন।
এ বছরের নভেম্বরে জি২০-ভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রনেতাদের সম্মেলনের আয়োজন করবে দক্ষিণ আফ্রিকা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ওই বৈঠক বয়কট করবেন ট্রাম্প। সেই কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না মার্কো রুবিও। শুধু তা-ই নয়, জি২০ ত্যাগের কথাও ঘোষণা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
ফেব্রুয়ারির জি২০ সম্মেলনে যোগ দেবেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে আমেরিকা। রুবিও সেখানে গেলে ল্যাভরভের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা ছিল। সেটা না হওয়ায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকেই।
জি২০ সম্মেলনে যোগ দিতে জোহানেসবার্গ উড়ে যাবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও। মার্কো রুবিও সেখানে গেলে তার সঙ্গে নানা বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারতে পারতেন তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ পাবেন না নয়াদিল্লির সাবেক দুঁদে আমলা।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, আমেরিকা শেষ পর্যন্ত জি২০ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে বিপাকে পড়বে ভারত। কারণ, সে ক্ষেত্রে সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চীন এবং রাশিয়ার হাতে চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৩ সালে দিল্লিতে বসেছিল জি২০-ভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রনেতাদের সম্মেলন। সেখানে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে নয়াদিল্লি। শুধু তা-ই নয়, একসঙ্গে আমেরিকা, রাশিয়া এবং চীনকে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার মুখে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে হওয়া ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন বা ন্যাটো) থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তবে এখনও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি তিনি। জি২০ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নমনীয় হন কি না, সেটাই এখন দেখার। সূত্র: আনন্দবাজার, সিবিসি
বিডি প্রতিদিন/একেএ