সারা দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও দেশকে অস্থিতিশীল করার কারণে এরই মধ্যে দেশের অনেক স্থানে গ্রেপ্তারও করেছে এই অভিযানের মাধ্যমে। গত শনিবার থেকে এই অভিযান শুরু হলেও ‘ডেভিল’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপারেশন চালাবে সরকার। দেশকে যারা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে তাদের ‘ডেভিল হান্ট’ অপারেশনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিল হান্টসহ বিভিন্ন অভিযানে দুপুর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ২৭৪ জনকে। অন্যদিকে সারাদেশের রেঞ্জ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ১ হাজার ৩৪ জনকে।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান নিয়ে পুরোদমে কাজ হচ্ছে। প্রত্যেক জেলায় এ নিয়ে ব্রিফ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই অভিযানের তদারকি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর মনিটরিং করবে পুলিশ সদরদপ্তর। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভা শেষে অভিযান নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি বলেন, দেশকে যারা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে তাদের ‘ডেভিল হান্ট’ অপারেশনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হবে। ‘ডেভিল হান্ট’ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, দেশের পরিস্থিতি অনেকেই অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সেটাকে স্বাভাবিক করতে এই অপারেশন চালানো হবে। এটা একটা পুলিশ অ্যাকশন। পুলিশের অধীনে হচ্ছে। সেনাবাহিনী এতে সহায়তা করবে।
সিনিয়র সচিব বলেন, ছয় মাস আগে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সে সময় আমাদের পুলিশ বাহিনীর বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং বেশ কিছু সমস্যা হয়েছে। অনেক থানা পোড়ানো হয়েছিল। এসব কারণেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। সচিব বলেন, এই অপারেশনে যৌথভাবে সবাই মিলে কাজ করবে। দেশের স্থিতিশীল অবস্থাকে অস্থিতিশীল করার যে চেষ্টা হচ্ছে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই অপারেশন চলবে। এর জন্য আইনানুগ পদ্ধতিতে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন সেটা নেওয়া হবে। সেটার জন্য সব বাহিনীকে প্রস্তুত ও ব্রিফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের কাজ চলমান।
সিনিয়র সচিব বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আগে যে আকারে আইন প্রয়োগ করা হতো আমরা সেভাবে হাঁটতে পারব না। আইনের স্পিরিটে কাজটা করতে হবে। সেজন্য আইন প্রয়োগের সঙ্গে যারা জড়িত, সব স্টেকহোল্ডারকে একত্রিত হয়ে কীভাবে আইনটাকে প্রয়োগ করতে পারি সে বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ডেভিল হান্টের তাৎপর্য কী জানতে চাইলে সচিব বলেন, প্রতিটি অপারেশনের একটি কোড নেম হয়। এটা অপারেশনকে ফোকাস করার জন্য। এই অপারেশন যারা পরিচালনা করছে তাদের ক্ষমতা কতটুকু জানতে চাইলে বলেন, পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের যে ক্ষমতা আছে সেই ক্ষমতাই পাবে। পুলিশের কেউ কেউ ভয়ে ও চাপে পড়ে অন্যায় করেছে মন্তব্য করে সিনিয়র সচিব বলেন, পুলিশের মধ্যে কিছু অতিউৎসাহী ছিল তারা পালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তার নিয়ে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
গাজীপুর : গাজীপুরে অপারেশন ডেভিল হান্ট-এর অভিযানে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) ৪২ জনকে এবং গাজীপুর জেলা পুলিশ ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে। আটককৃতদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থক। দেশজুড়ে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্টের অংশ হিসেবে অভিযান চালিয়ে তাদের জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজশাহী : ডেভিল হান্ট অপারেশনের জন্য রাজশাহীতে টহল জোরদার করেছে যৌথবাহিনী। গতকাল দুপুর থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় টহল শুরু হয়। মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে চালানো হয় তল্লাশি। তবে বিকাল পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।
গাইবান্ধা : অপারেশন ডেভিল হান্টের প্রথম দিন গাইবান্ধার সাঘাটা থেকে সিরাজুল ইসলাম (৫০) নামে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। সিরাজুল ইসলাম সাঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাঘাটা বাজার এলাকার মৃত কোরবান আলীর ছেলে। গতকাল দুপুরে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি শাহিনুর ইসলাম তালুকদার জানান, শনিবার দিবাগত রাতে উপজেলার সাঘাটা বাজার এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
কুমিল্লা : অপারেশন্স ডেভিল হান্টের অংশ হিসেবে কুমিল্লায় গতকাল বিকাল পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিন থানা থেকে গ্রেপ্তার তিনজনই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী।
ঠাকুরগাঁও : অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানে ঠাকুরগাঁওয়ে ১৫ জন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার দিবাগত রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় চারজন, পীরগঞ্জ থানায় দুজন, রুহিয়া থানায় দুজন, রাণীশংকৈল থানায় দুজন, বালিয়াডাঙ্গী থানার পাঁচজন রয়েছেন। গ্রেপ্তাররা সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ করতেন।
নোয়াখালী : অপারেশনের প্রথম দিনে নোয়াখালীর হাতিয়ায় যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ সাতজনকে আটক করেছে। আটকরা হলেন- হাতিয়া উপজেলার চরঈশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আজাদ (৬৪), হাতিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বেলাল উদ্দিনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (২৬), ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আবদুস শহিদের ছেলে আবুল কালাম বিটু (৪৪), নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের আদর্শগ্রামের আলাউদ্দিনের ছেলে আজিম উদ্দিন (৩১), তমরুদ্দি ইউনিয়নের মহিন উদ্দিনের ছেলে সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ রাকছান (২৪), হাজী আবদুল কাইয়ুমের ছেলে আবদুল মাজেদ পলাশ (৪৩) ও আবদুল জাহের (৩৯)।
শ্রীপুর (গাজীপুর) : গাজীপুরের শ্রীপুরে অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানের অংশ হিসেবে যৌথবাহিনী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ১০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। শনিবার রাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।