ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভের পানির স্তর। শুষ্ক মৌসুমে যতটুকু পানি তোলা হচ্ছে, বর্ষায় তা পূরণ হচ্ছে না। উল্টো প্রতিনিয়ত নানা কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। নদীমাতৃক দেশ হওয়ার পরও কৃষিতে সেচের বড় অংশ পূরণ করা হয় ভূগর্ভের পানি দিয়ে। ফলে মাটির নিচে তৈরি হচ্ছে শূন্য গহ্বর। এতে অদূর ভবিষ্যতে শুধু সুপেয় পানির সংকটই নয়, মাটি দেবে যাওয়া বা ভূমিধসের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
তথ্যানুযায়ী, সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে যতটুকু পানি তোলা হয়, বর্ষায় নদনদী, খালবিল, পুকুরসহ বিভিন্ন জলাশয় এবং মাটি দিয়ে ধীরে ধীরে বৃষ্টির পানি নিচে গিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করে। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে একদিকে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন বেড়েছে, অন্যদিকে সেই শূন্যতা পূরণের সুযোগ কমেছে। ফলে প্রতিবছর পানির স্তর নিচেই নামছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, গেল ৫০ বছরে ঢাকার পানির স্তর আগের তুলনায় অন্তত ২৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে জনসংখ্যা ও শিল্পকলকারখানা বৃদ্ধিতে পানির চাহিদা বেড়েছে। অল্প জমিতে অধিক মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষিতেও সেচের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে জলাশয় ভরাট ও দূষণের কারণে কমে গেছে ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস। অনেক এলাকায় একাধিক নদী থাকলেও দূষণের কারণে ভূগর্ভের পানির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। চারটি নদী দিয়ে ঘিরে থাকা ঢাকার জন্য শুধু ঢাকা ওয়াসাই প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে থাকে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়ে সাবেক স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম গত সংসদে জানিয়েছিলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা শহরে ৬৬ শতাংশ ভূগর্ভস্থ এবং ৩৪ শতাংশ ভূউপরিস্থ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।’ আবার পাকা স্থাপনা বাড়ায় বৃষ্টির পানি নিচে যেতে পারছে না। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমছে। সব মিলিয়ে একটা বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে দেশ।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৪ সালে এসে ৮৬ মিটারে নেমেছে। অর্থাৎ, ভূগর্ভের পানি পেতে পাইপ পাঠাতে হচ্ছে ৮৬ মিটার বা ২৮২ ফুট নিচে। আগের স্তরগুলো এখন ফাঁপা। প্রতিবছরই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নামছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানযায়ী, বোরো মৌসুমে দেশের অধিকাংশ এলাকার পানির লেয়ার নিচে নামছে। তার মধ্যে অনেক এলাকায় পানির লেয়ার বৃষ্টির সময়ে আগের অবস্থানে ফিরে এলেও ঢাকাসহ নগর ও শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পানির স্তর শুধু নামছেই। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২৩ সালে ল্যান্ডসেট স্যাটেলাইট বিশ্লেষণী গবেষণা অনুযায়ী, গত ২৮ বছরে শুধু ঢাকা থেকেই ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি এ সময়ে নির্মাণ এলাকা বা স্থাপনা বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। সবুজ গাছপালা এবং জলাশয়ে জায়গায় হয়েছে কংক্রিটের স্থাপনা, যা ভূগর্ভের পানির স্তর পূরণে বাধা দিচ্ছে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলায় ভিতর দিয়ে অনেক নদী বয়ে গেলেও শিল্পদূষণের কারণে সেই পানি ব্যবহারের উপযোগী নেই। ফলে ৪ হাজারের মতো পোশাক কারখানার পানির চাহিদা মেটানো হচ্ছে গভীর নলকূপ দিয়ে। পুকুর বা ইঁদারা হারিয়ে যাওয়ায় প্রায় সব কটি উপজেলাতেই বাসাবাড়ি ও কৃষিজমিতে সেচের জন্য একমাত্র উৎস হিসেবে ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে এই জেলাটির ভূগর্ভের পানির স্তরও নিম্নমুখী।
জানা গেছে, ২০০০ সালের দিকে এই অঞ্চলে ৭০ থেকে ৮০ ফুট খনন করেই পানির স্তর পাওয়া যেত। এখন ৪০০ ফুট বা তার অধিক গভীরে যেতে হয় পানির নাগাল পেতে। প্রতি বছর ৫-১০ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। কাক্সিক্ষত পানি পেতে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত পানির মোটরগুলোর ভূগর্ভের পাইপ এলাকাভেদে দুই-এক বছর পরপরই জোড়া দিয়ে গভীরে নিতে হচ্ছে।
দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও ভূগর্ভের পানির স্তর দ্রুত নামছে। যশোরাঞ্চলে অধিকাংশ উপজেলায় খরা মৌসুমে পাম্প ও নলকূপে পানি উঠছে না। কয়েক বছর ধরেই এই সমস্যা বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। গত বছরের তাপপ্রবাহের সময় সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভোগে জেলাটির বাসিন্দারা। ঠিকভাবে পানি উঠছে না কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ৫০ হাজারের বেশি গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়েও, যা ওই অঞ্চলের কৃষিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে শীর্ষে থাকা দেশের তালিকায় এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১০টি দেশ স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।