গণঅভ্যুত্থানে ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সহিংসতার ঘটনায় বিশেষ করে ১৫ জুলাই হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করেছে সত্যানুসন্ধান কমিটি।
বৃহস্পতিবার উপাচার্যের অফিস সংলগ্ন সভা কক্ষে সত্যানুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ একটি তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের কাছে হস্তান্তর করেন।
জুলাইয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করে কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ বলেন, ‘একপক্ষ আরেক পক্ষের আহ্বানে গিয়েছে দেখলে মনে হবে সাধারণ সংঘর্ষ, কিন্তু এটি ছিল পুরোই পরিকল্পিত। একদিনের প্ল্যানে এটি হয়নি। মারামারি লেগে গিয়েছে, বাহির থেকে কর্মী আনলাম, বিষয়টি এমন ঘটেনি। একই সময়ে সাদা ক্যাপ পরিহিত দুটো টিম একই সময়ে মল চত্বরে এবং ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সি গেটে অবস্থান ছিল, তারপরে সরকারি বাঙলা কলেজ-কবি নজরুল কলেজ শিক্ষার্থীদের কিছু বাসও ছিল। এই বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় এটি একদিনের পরিকল্পনা না।’
ছাত্রীদের ওপর হামলা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং আহতদের ওপর হামলা- এ তিন ক্যাটাগরিতে অপরাধ নিরূপণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা হয়েছে জানিয়ে ওই সহযোগী অধ্যাপক আরও বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং প্রমাণ মিলেছে তাদের নাম প্রতিবেদনে এসেছে। এছাড়া এর বাইরে বহিরাগতরাও রয়েছে। এখন জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নেবে, সেটি একাডেমিক ব্যবস্থা বা হল কেন্দ্রিক ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে আমরা জড়িতদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুপারিশ করেছি। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি অপরাধে শাস্তি দিতে পারে না, শুধু সুপারিশ করতে পারে। এছাড়া বহিরাগত যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবগত করা হবে, তারা সেই বিষয়টি দেখবেন। তারপরেও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তখন পুলিশি মামলাও হতে পারে।’
প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কেউ জড়িত আছে কি না তার প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, তবে থাকলেও থাকতে পারে। প্রতিবেদনে ছবি পেয়েছি, ১৫ জুলাই মুজিব হলের পকেট গেট দিয়ে বহিরাগত প্রবেশ করেছে। হলের কর্মচারীরা প্রভোস্টকে ফোন করেছেন, প্রভোস্ট সেখানে যাননি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চলাকালীন প্রায় ৭০ জন শিক্ষককে পাওয়া গেছে যারা সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ছাত্রদল-শিবির-রাজাকার ট্যাগিং করা হয়েছিল, যা আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছে। কেননা শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীরা প্রভাবিত হবে সেটা স্বাভাবিক। এ বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাইলে অনেকে স্বীকার করেছেন এবং সেটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, আমরা সেটা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।’
এক পাক্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে কাজী মাহফুজুল হক সুপণ বলেন, ‘আমরা যখন যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, আমরা সেটি নিয়েই কাজ করেছি। আমরা তদন্ত করার সময় বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ খুঁজতে গেলে সেখানে কোনও হার্ডডিস্ক পাইনি। সব হার্ডডিস্ক সরিয়ে ফেলা হয়। আমরা সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে একটা মেইলও নম্বর পাঠাই। শিক্ষার্থীরা সেখানে জুলাই হামলার নানা ছবি, ভিডিও পাঠায়। এছাড়া আমরা ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল পত্র-পত্রিকার সংবাদগুলো দেখেছি, সেটার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে ভিডিওয়ের প্রত্যেকটি লোকেশনে গিয়েছি। সবদিকে বিবেচনায় আনা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।’
এদিকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ‘তথ্যানুসন্ধান কমিটি ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করে। সীমিত রিসোর্স নিয়ে কয়েক হাজার আক্রমণকারীকে চিহ্নিত করা দুঃসাধ্য। এ কাজটি করতে পারে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সত্যানুসন্ধান কমিটির অসমাপ্ত কাজ রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে সত্যানুসন্ধান কমিটি আশা প্রকাশ করছে।’
এর আগে প্রতিবেদন গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি বলেন, ‘এই রিপোর্ট এখন পর্যন্ত পাবলিক ডকুমেন্টস না। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিলগালা এই রিপোর্টটি সিন্ডিকেটে উন্মোচন করা হবে এবং সেখানেই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আলোচায় একাধিক সভা লাগলেও লাগতে পারে। সিন্ডিকেট ট্রাইব্যুনাল গঠনসহ পরবর্তী প্রয়োজন সাপেক্ষে আইনগত পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে।’
এসময় অন্যান্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ এবং সত্যানুসন্ধান কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ