তিন দশক আগে, বিশ্ব এক পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু জিমি কার্টারের উত্তর কোরিয়া সফর সবকিছু বদলে দেয়।
১৯৯৪ সালের জুনে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, উত্তর কোরিয়ার তৎকালীন নেতা কিম ইল সাং এর সঙ্গে আলোচনার জন্য পিয়ংইয়ংয়ে পৌঁছান। এটি ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা, কারণ ওইবারই প্রথমবার কোনো বর্তমান বা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন।
এই সফর ছিল কার্টারের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। অনেকের মতে, এটি অল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করেছিল, যা লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারত। এছাড়া, এটি পিয়ংইয়ং ও পশ্চিমাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একটি যুগের সূচনা করেছিল। এর কোনো কিছুই হতো না যদি না কার্টার, তার কূটনৈতিক চালগুলো চালতেন।
জিমি কার্টার ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ১০০ বছর বয়সে মারা যান।
উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ জন ডেলুরি বিবিসিকে বলেন, কিম ইল-সাং এবং বিল ক্লিনটন একটি সম্ভাব্য সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং কার্টার সেই ফাঁকা স্থানটি পূরণ করেন। সঠিক সময় এগিয়ে এসে সফলভাবে একটি আলোচনার পথ খুঁজে বের করেন তিনি।’
১৯৯৪ সালের শুরুর দিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলাকালীন ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ং-এর মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সন্দেহ ছিল যে চলমান আলোচনা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল। এর মধ্যেই উত্তর কোরিয়া ঘোষণা করে যে তারা ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক চুল্লি থেকে হাজার হাজার জ্বালানি রড পুনঃপ্রক্রিয়ার জন্য সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।
এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার আগে হওয়া একটি চুক্তির লঙ্ঘন, যেখানে এমন পদক্ষেপের জন্য আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়াও উত্তর কোরিয়া আইএইএ থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়।
এতে ওয়াশিংটনের সন্দেহ বেড়ে যায়, তাদের ধারণা ছিল যে পিয়ংইয়ং সম্ভবত একটি অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে মার্কিন কর্মকর্তারা পিয়ংইয়ং এর সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে দেন।
ওয়াশিংটন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিতেও শুরু করে, যার মধ্যে ছিল জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি। পরবর্তীতে কিছু সাক্ষাৎকারে, মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে তারা ইয়ংবিয়নে বোমা ফেলা বা একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথাও ভেবেছিলেন। যা কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ বাধানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল ধ্বংস করে দিতে পারতো বলে তাদের ধারণা। এই উত্তেজনাকর পরিবেশেই কার্টার তার পদক্ষেপ নেন।
কিম ইল-সাং বহু বছর ধরে ব্যক্তিগতভাবে কার্টারকে উত্তর কোরিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছিলেন।
১৯৯৪ সালের জুন মাসে, যখন কার্টার ওয়াশিংটনের সামরিক পরিকল্পনার কথা শুনলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও চীনের (উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র) সঙ্গে আলোচনা করলেন, তখন তিনি অবশেষে কিমের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
কার্টার বিবিসিকে বলেন,‘আমরা যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিলাম’। তিনি পরবর্তীতে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম পিবিএসকে বলেন,‘এটি দ্বিতীয় কোরীয় যুদ্ধে পরিণত হতে পারত, যেখানে দশ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারত। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষতিকর পদার্থের উৎপাদন চলতে থাকত, যদি আমাদের যুদ্ধ না হত।’
কার্টারের সফরটি ছিল কূটনৈতিক কৌশল এবং ঝুঁকি নেওয়ার একটি চমৎকার উদাহরণ। ওই সফরের সময় কার্টার তার কূটনৈতিক দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন।
কার্টার প্রথমে কিম ইল সাং এর আন্তরিকতা যাচাই করতে একাধিক শর্ত দিয়েছিলেন, যার মধ্যে শেষটা ছাড়া সব দাবিই মেনে নেন কিম।
কার্টারের শর্তের মধ্যে ছিল তিনি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ডিমিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড) পাড়ি দিয়ে পিয়ংইয়ং যাবেন। ডিএমজেড এমন এক ভূখণ্ড, যা দুই কোরিয়ার মধ্যে একটি বাফার জোন হিসেবে কাজ করে।
কার্টার সে সময় বলেছিলেন, ‘তাদের (পিয়ংইয়ং) প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল যে গত ৪৩ বছর কেউ এমনটা করেনি, এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবকেও পিয়ংইয়ংয়ে যেতে বেইজিংয়ের মাধ্যমে যেতে হয়েছিল। আমি বললাম, ঠিক আছে, ‘তাহলে আমি যাব না’,’
কিম প্রথমে এতে রাজি না হলেও এক সপ্তাহ পর তার শর্ত মেনে নেন। কার্টারের পরবর্তী পদক্ষেপটি ছিল আরও কঠিন-তার উত্তর কোরিয়ায় যাওয়ার ব্যাপারে নিজের সরকারকে রাজি করানো।
উত্তর কোরিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মধ্যস্থতাকারী রবার্ট গ্যালুচি পরে বলেছিলেন, যে ‘একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে সবাই অস্বস্তি বোধ করছিল’।
প্রথমে কার্টার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি চাইলে, তারা তাকে কোনো সাড়া দেয়নি। কিন্তু তিনি দমে না গিয়ে, সরাসরি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি যাচ্ছেন, তা যা-ই হোক না কেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর তার সহায়ক হিসেবে সামনে আসেন, যিনি ক্লিনটনের কাছে পাঠানো কার্টারের বার্তা গ্রহণ করেন।
‘(আল গোর) আমাকে ফোন করে বলেছিলেন যে আমি যদি ‘আমি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি’ বাক্যটি পরিবর্তন করে ‘আমি যাওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছি’ করি, তবে তিনি ক্লিনটন থেকে সরাসরি অনুমতি নিয়ে আসবেন…তিনি পরের দিন সকালে আমাকে ফোন করে জানান যে আমি যেতে পারব।’ অবশেষে সফরের অনুমতি মেলে।
গভীর সংশয়
১৯৯৪ সালের ১৫ জুন, কার্টার তার স্ত্রী রোজালিন, একটি ছোট দল ও টিভি ক্রু নিয়ে উত্তর কোরিয়া পাড়ি জমান। কিমের সঙ্গে দেখা করা ছিল কার্টারের জন্য একটি নৈতিক দোলাচল।
পিবিএসকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ৫০ বছর ধরে কিম ইল সাংকে ঘৃণা করতাম। আমি কোরীয় যুদ্ধের সময় প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি সাবমেরিনে ছিলাম, এবং আমার অনেক সহকর্মী সেই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল, আমি মনে করি এটা তার অযথা উস্কানির কারণে হয়েছিল।’
‘তার ব্যাপারে আমার অনেক সন্দেহ ছিল। কিন্তু যখন আমি সেখানে পৌঁছালাম, তিনি আমাকে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি বেশ কৃতজ্ঞ ছিলেন যে আমি এসেছি।’
তার পরের কয়েকদিন, কার্টার এবং তার প্রতিনিধিরা কিমের সঙ্গে বৈঠক করেন, পিয়ংইয়ংয়ের একটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেন এবং কিমের ছেলে কিম জং ইলের মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে (ইয়ট) সফর করেন।
কার্টার বুঝতে পারেন, তার ধারণাই ঠিক ছিল: উত্তর কোরিয়া ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক স্থাপনার ওপর মার্কিন সামরিক আক্রমণের ভয় পাচ্ছিল না, বরং তারা যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি কিমের উপদেষ্টাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়েছিলাম তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কিনা। তারা খুব স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, ‘হ্যাঁ, আমরা তা করছিলাম।’
‘উত্তর কোরিয়া তাদের দেশকে নিন্দিত হতে এবং তাদের নেতার অপমানিত হওয়া নিতে পারছিল না এবং তারা এর জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল।’
‘আমি মনে করি, এই ছোট এবং আত্মত্যাগী দেশটির মানুষেরা তাদের দেশের নিন্দা এবং তাদের সম্মানিত নেতা যাকে তারা ‘গ্রেট লিডার’ হিসেবে ডাকে তার অপমান সহ্য করতে পারছিল না’।
‘নিজেদের সম্মান এবং অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য যে উত্তর কোরিয়ার মানুষ মৃত্যুসহ যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিল, যা আমার মতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত’ জানান তিনি।
কার্টার ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কিছু দাবি এবং নিজের কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করা, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি শান্তি আলোচনা শুরু করা, একে অপরের দেশ থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা এবং উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে সমাহিত মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ উদ্ধার করার উদ্যোগ নেয়া।
বিডি-প্রতিদিন/বাজিত