মিয়ানমারে উৎপত্তি হওয়া ৭ দশমিক ৭ তীব্রতার ভূমিকম্পে প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে নির্মাণাধীন ৩০ তলা ভবন নিমেষে ধসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এটি একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নিখোঁজ হন ৪৩ শ্রমিক। এ ছাড়া মিয়ানমারে ১৮৮ ও থাইল্যান্ডে আটজন মারা যান। এ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশও। ধসে পড়া ভবনটি সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছিল।
মিয়ানমারে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৪-এ দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৭৩০ জন। গতকাল দুপুরে দেশটি বড় দুটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। মৃত্যুর সংখ্যাটি নিশ্চিত করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সামরিক সরকারের কর্মকর্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং টেলিভিশন ভাষণে বলেছেন, ‘নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
মিয়ানমার ছাড়াও শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। সেখানে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। ব্যাংককে একটি নির্মাণাধীন ৩০ তলা ভবন ধসে পড়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এপি জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর তোলা ছবিতে দেখা গেছে, সরকারি কর্মচারীদের ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা সেখানে আটকে পড়াদের বের করার চেষ্টা করছেন।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মান্দালয় রাজ্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এক উদ্ধারকারী জানিয়েছেন, মান্দালয়ের অবস্থা বেশ খারাপ। সেখানে শত শত মানুষের মৃত্যুর শঙ্কা করছেন তিনি।
কম্পনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় মান্দালয়ের বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা আক্রান্ত এলাকায় কীভাবে পৌঁছাবেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশটিতে ২০২১ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। এতে সেখানে মানবিক বিপর্যয় চলছিল। এ ভূমিকম্প পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে। মান্দালয়ের সড়কের পাশাপাশি মা সো ইয়েন নামে একটি মঠ ধসে পড়েছে। এটি দেশটির সবচেয়ে বড় মঠ। এ ছাড়া ভেঙে পড়েছে পুরোনো রাজপ্রাসাদও। এর মধ্যে দাতব্য সংস্থা ক্রিস্টান এইড জানিয়েছে, সেখানে একটি বাঁধ ফেটে গেছে। এতে নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল দুপুরে আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পের প্রথমটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৪। মিয়ানমারের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে সাগাইং শহরের ১৬ কিলোমিটার (১০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে ১৬ কিলোমিটার গভীরে এ ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে জানিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। বার্তা সংস্থা আনাদোলু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম খিত তিতের বরাতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মান্দালয় প্রদেশের ফো শিং মসজিদ ধসে পড়েছে। এ ছাড়া সেখানে আরও অন্তত তিনটি মসজিদ ভেঙে পড়েছে। মসজিদ ধসে পড়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া তুয়াঙ্গো সিটির মঠ ধসে পাঁচ উদ্বাস্তু শিশু নিহত হয়েছে। তারা সেখানে আশ্রয়ে ছিল। সময় যত গড়াচ্ছে চারদিক থেকে ততই মৃত্যুর তথ্য আসছে।
মসজিদ ধসে নিহত অন্তত ২০ : ভূমিকম্পের সময় মান্দালয় বিমানবন্দরের যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মিয়ানমারের এ অঞ্চলেই মসজিদ ধসে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল দুপুরে মিয়ানমারে আঘাত হানে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প। এটির প্রভাবে কেঁপে ওঠে থাইল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ। বার্তাসংস্থা আনাদোলু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম খিত তিতের বরাতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মান্দালয় প্রদেশের ফো শিং মসজিদ ধসে পড়েছে। এ ছাড়া সেখানে আরও অন্তত তিনটি মসজিদ ভেঙে পড়ে। মসজিদ ধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন মারা গেছেন। একজন উদ্ধারকর্মী বলেছেন, ‘আমরা যখন নামাজ পড়ছিলাম তখন এটি ধসে পড়ে। তিনটি মসজিদ ধসে পড়েছে। মানুষ আটকে আছেন। এখন পর্যন্ত অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা বেশি হতে পারে। শি ফো শিং মসজিদও ধসে পড়েছে।’
মিয়ানমারে নিহতের সংখ্যা ছাড়াতে পারে হাজার-ইউএসজিএস : যে ব্যাপক শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে মিয়ানমারে, তাতে মোট নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের হালনাগাদ অবস্থা সম্পর্কে এখনো বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে থাইল্যান্ডে ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন চিত্র, ভিডিও ও তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে এবং এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ভূমিকম্পটি বেশ বিধ্বংসী ছিল।
মিয়ানমারের ছয় অঞ্চল ও ব্যাংকক শহরে জরুরি অবস্থা : মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার ইতোমধ্যে রাজধানী নেপিদোসহ ছয়টি শহর ও অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। বাকি পাঁচটি অঞ্চল হলো- সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, বাগো, পূর্বশান। বার্তাসংস্থা এএফপি জানায়, ভয়াবহ এ ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা। এদিকে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতান সিনাওয়াত্রাও রাজধানী ব্যাংককে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। মান্দালয়ের একজন বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘সবকিছু কাঁপছিল, তখন আমরা সবাই বাইরে বের হয়ে আসি। আমি চোখের সামনে একটি পাঁচ তলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর সড়কে ফাটল ধরেছে।