স্কুলে আমাদের ড্রয়িং টিচার ছিলেন আনোয়ার উল্লাহ। গুণী মানুষ। গান গাইতেন। ক্রিকেট খেলতেন। বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের দিন খাওয়ানো হতো তাঁরই রান্না করা বিরিয়ানি। নিজের ইতিবাচক ব্যাপারগুলো তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সঞ্চারণে সচেষ্ট থাকতেন। অন্যদের কথা জানি না, সুযোগ পেলে আজও বাহাদুরি দেখানোর মতলবে যে আঁকাআঁকি করি তা ওই অঙ্কনগুরু প্রদত্ত বিদ্যারই ছায়াপাত। স্টুডেন্টস কমনরুমের দেয়ালে ঝুলন্ত ফ্রেমবন্দি ছবি আর হিতকথাগুলোর অধিকাংশই তুলির ছোঁয়ায় শিল্পমণ্ডিত করেছেন আনোয়ার উল্লাহ স্যার।
দেয়ালশোভিত হিতকথার প্রায় সবই মুখস্থ করে ফেলেছিল সহপাঠী ফজলুল হাকিম। এ জন্য তার প্রতি খুবই প্রীতিভাব পোষণ করছিলেন আউস। আনোয়ারের ‘এ’+উল্লাহর ‘ইউ’+স্যারের ‘এস’। তিনে মিলে ‘আউস’ শব্দটির উদ্ভাবক ফজলুল রঙ্গ করে বলে- ‘আউস-এর মতো আর্টিস্ট হবাম/এটা আমার দীর্ঘকালের হাউস/আর্টিস্ট হইয়া আঁকুম ছবি ঢাউস ঢাউস।’
বিচ্ছুর বিচ্ছু ফজলুর রঙ্গতামাশার সংবাদ পেয়ে গেলেন আউস। নীতিনিষ্ঠ কড়ামেজাজি আনোয়ার উল্লাহ স্যার ফাজলামোর বিরুদ্ধে কুপিত হয়ে কী কী করতে পারেন, তার অলিখিত তালিকা প্রস্তুত। সম্ভাব্য হচ্ছে- পিরিয়ড শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসের শেষ বেঞ্চটির ওপর ফজলুকে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। তা হলো না। কারুকাজখচিত পাঞ্জাবি পরা, সুবিন্যস্ত দাড়িভরা মুখে ‘মজা পেলাম’ স্টাইলের হাসি ফুটিয়ে স্যার বললেন, হয়ার ইজ মাই মিসগাইডেড হনুমান ফজলু? ভয়ার্ত ফজলু মাথা গুঁজে বসা ছিল লাস্ট বেঞ্চের আগের বেঞ্চে। শাস্তি হবে না, হলেও সেটা কঠিন হচ্ছে না, টের পেয়ে ফজলু আওয়াজ ছাড়ল ‘ইয়েস স্যার!’
সপাং সপাং বেত ঘুরিয়ে আনোয়ার উল্লাহ স্যার বলেন, তোর সিট তো সেকেন্ড রোতে। অত দূরে গিয়ে বসলি যে? ওখানে কী কড়ই গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়বার ফন্দি করছিস? সামনে আয়...। আয় বলছি... আজ তোর ইয়েস স্যারের তেরোটা বাজানোর আগে থামছি না।
স্যারের টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আপাতত সুবোধ বালক ফজলুল হাকিম। তাকে এবং ক্লাসকে স্যার জানান, মহান পুরুষদের বাণী মুখস্থ করলে মহত্ত্ব অর্জনের সাধনবাসনা জাগ্রত হয় মনে করাটা ভুল। মুখে এক অন্তরে আরেক হওয়া তো এই ব-দ্বীপের জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য। অধিবাসী মানুষ যেখানে ঐতিহ্যচ্যুত হওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না, সেখানে একটা হনুমান সুন্দর সুন্দর কিছু কথা উচ্চারণ করে বলে তার লেজ খসতে শুরু করেছে ধরে নেওয়াটা বিরাট আহাম্মকি।
নিজের দুই কান নিজ হাতে ধরে রেখে লাস্ট বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে রাখার শাস্তি-পদ্ধতি পরিহার করে ড্রয়িং স্যার ‘ডান হাতে ছয়/বাম হাতে ছয়’ বেত্রাঘাত রীতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, সমস্যা হলো ডেপুটি সুপার অব পুলিশের ছেলে ফজলু একডজন বেতের ঘা পেয়েছে, এই দুঃখজনক খবর শহরে ছড়িয়ে পড়বে। বাবা-মার কানেও খরবটা পৌঁছাবে। তাঁরা মর্মাহত হবেন। এই পরিস্থিতি এড়ানোর উপায়ও একটা আছে। ক্লাসের সবাই বলে, কী স্যার! সেটা কী!
‘মহৎ পুরুষদের যেসব বাণী মুখস্থ করেছি নিজের জীবনে সেগুলো প্রয়োগের যথাসাধ্য চেষ্টা আমি করব’- এই অঙ্গীকার ঘোষণা করবে ফজলুল হাকিম। আমরা করতালি দিলাম। সহাস্যবদন স্যারও করতালি দেন। ফজলু অঙ্গীকার করলে আবার করতালি। সঙ্গে ছিল হর্ষধ্বনি। হঠাৎ ফজলুকে টান মেরে মঞ্চে (যেখানে স্যারের টেবিল-চেয়ার) ওঠান আউস। বলেন : এখন ফজলু আমাদের সাত মহৎপ্রাণের মুখনিঃসৃত বাণী শোনাবে।
ফজলু উচ্চারিত ওসব বাণীর পাঁচটি আজও আমার মনে আছে : (১) ‘ট্রাই টু লার্ন সামথিং অ্যাবাউট এভরিথিং অ্যান্ড এভরিথিং অ্যাবাউট সামথিং।’ (২) ‘লাইফ ইজ নট ফাইন্ডিং ইয়োরসেলফ। লাইফ ইজ অ্যাবাউট ক্রিয়েটিং ইয়োরসেলফ।’ (৩) ‘নিজ দায়িত্ব পালনে ব্রতী হও, অন্যে তোমার কাছে কৈফিয়ত চাইবে না।’ (৪) ‘কর্মই বিরক্তি, পাপ ও দারিদ্র্য’- এ তিন অমঙ্গল দূর করে। (৫) ‘গৌরব ক্ষণিকের কিন্তু অখ্যাতি চিরকালের।’
কথাগুলো বলে গেছেন : (১) টমাস হেনরি হাক্সলি, (২) জর্জ বার্নার্ড শ, (৩) হজরত আলী, (৪) ভলতেয়ার ও (৫) নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।
প্রচণ্ড ধমক : একবার স্কুলে সাজ সাজ রোয়াব ওঠে। অনেক উঁচু, প্রায় পাঁচ ফুট ব্যাসের কাণ্ড দুই শিশু গাছকে দুই পাশে রেখে যে রাস্তাটি গেছে মূল ভবনের বারান্দা পর্যন্ত তার সংস্কার হলো। ফুল বাগান করা হয় পারিপাটি। স্কাউটরা যন্ত্রসুরের রেওয়াজ করছে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত, ‘খাইবার দ্বারে তার পতাকাবাহী/মেঘনা কূলের যত বীর সিপাহী...।’ গান; সঙ্গে বাজছে ড্রাম। মিলনায়তনের মঞ্চে সমবেত কণ্ঠের ‘বরিষো ধরা মাঝে শান্তির বারি’ গানের অনুশীলন করাচ্ছেন বিখ্যাত গায়ক সত্য গোপাল নন্দী। সব আয়োজন এক ব্যক্তিকে তুষ্ট করার জন্য। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিদ্যালয় পরিদর্শক। কিন্তু তাঁর মর্যাদা উচ্চতা ক্ষমতা আভিজাত্যের ইঙ্গিতবাহী শব্দ ‘রেন্জ ইনসপেক্টর’ আসছেন। রেন্জ ইনসপেক্টর আসছেন ধ্বনিত হচ্ছিল। নির্ধারিত দিনে তিনি এলেন।
ক্ষমতাধররা আসেন, দেখেন এবং নাকি জয় করেন। স্ফীত উদর, মোটাসোটা ফরসাদেহী মাঝারি উচ্চতায় রেন্জ ইনসপেক্টর (আর আই) এলেন, দেখলেন এবং ধমক মারলেন। প্রচণ্ড ধমক। শিক্ষকরা তাঁকে অতি বিনীত ভঙ্গিতে অভ্যর্থনা জানানোর পরপরই তিনি প্রতিটি ক্লাসে ঢুঁ মারেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপও করলেন। হোয়াটস ইয়োর নেম, হাউ ইয়োর স্কোর ইন দ্য লাস্ট একজাম, টেলমি হু ইজ দ্য প্রভিন্সিয়াল ওয়ার্কস মিনিস্টার ইত্যাদি।
পূর্তমন্ত্রী কে? প্রশ্নটি আমাকেই করা। উত্তরটা সঠিক দিতে পারায় বুক প্রসারিত হয়। কিন্তু মন করে খচখচ। শিক্ষালয় পরিদর্শক শিক্ষামন্ত্রীর নাম জানতে চাওয়া উচিত ছিল। আমি শিক্ষার্থী; আমি শিক্ষামন্ত্রী বুঝব- পূর্তমন্ত্রীর কাছে আমার কী কাম? তবে আল্লায় বাঁচাইছে। বাণিজ্য বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম জানতে চাননি। কোনো কাম না থাকায় ওই দুজনের নাম ছিল অজানা।
এ ক্লাস, ও ক্লাস ঘুরে আর আই মহোদয়ের স্টুডেন্টস কমন রুমে প্রবেশ। স্যারদের পিছু পিছু আমরাও ওই রুমে। আর আই হেড স্যারের সঙ্গে কিছুক্ষণ পিংপং খেলার পর দেয়ালে শোভিত ছাত্রদের আঁকা বিভিন্ন ছবি দেখতে লাগলেন। দেখেন আর ফাইন! ভেরি নাইস। একসেলেন্ট বলেন। একটি ফ্রেমের সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ান। প্রশ্ন করেন, ‘হু রোট দিস্?’ সামনে এগিয়ে গিয়ে আনোয়ার উল্লাহ সহাস্যে বলেন, ‘আমি স্যার।’
‘আপনি? আর ইউ ইনসেন?’ গর্জে ওঠেন আর আই, ‘নামান। এখনই নামান।’ ধমকের চোটে বিষণ্ন হয়ে গেলেন আউস। দ্রুত ফ্রেমটি নামানো হলে দেখি তাতে লেখা- ‘মৃত্যুই জীবনের অপরিহার্য পরিণাম।’ আর আই কটমট করে হেড স্যারের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ছেলেপিলেদের হতাশা শেখানোর অধিকার কে আপনাদের দিয়েছে? চোখের সামনে বারবার ‘মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু’ লেখা দেখলে ওদের মনে ভয়ংকর প্রশ্ন জাগবে। ওরা তখন ভাববে- মরেই তো যাব, পড়ালেখা করে কী লাভ?”
উচিত-অনুচিত : মরণচিন্তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। যা ঘটবেই তার জন্য উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন মনোবিদরা। সমাজহিতৈষীদের কেউ কেউ বলেন, মরণচিন্তা পুরোপুরি বর্জন অনুচিত। মরণ আসন্ন, এই বোধ নাকি মানুষের লোভলালসার নিয়ন্ত্রক। মনে আছে, সেবা সংগঠন ‘বাঁচতে শেখো’র পরিচালক অ্যাঞ্জেলা গোমেজ ২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ প্রদত্ত সম্মাননা গ্রহণের পর দেওয়া ভাষণে আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে দুস্থের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অ্যাঞ্জেলা বলেন, ‘একটা বালিকণা পৃথিবীতে যত কোটি বছর বেঁচে থাকে তার লাখ লাখ ভাগের এক ভাগ সময়ও মানুষ বাঁচে না। তাহলে অর্থবিত্তের জন্য মানুষের কেন এত লোভ? কেন এত হাহাকার?’
সময় জীবনকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়। সময়ের নির্দেশে আমরা ‘খাই খাই/দাও দাও আরও দাও’ করি। চাওয়া আর চাওয়া ছাড়া যেন আর কোনো করণীয় নেই। ওই উদগ্র বাসনায় মানুষ এতটাই তাড়িত হয় যে ধেয়ে আসা অলৌকিক ট্রেন সে দেখতে পায় না। আধুনিক এক কবিতায় আছে-“কুয়াশার ভিতর দিয়ে ছুটে আসছে অলৌকিক ট্রেন/দাঁড়িয়ে আছি প্ল্যাটফর্মে তার অপেক্ষায়/তার যাত্রী হতেই হবে আমরা নিরুপায়/‘এসে গেছি, ভেতরপানে এসো’, হাঁক দেবে নিঃশব্দ এক সাইরেন।”
গেল বছর ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে হঠাৎ কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যায় আমার বোধ। সাইরেনের আওয়াজ পাই। নিজেকে বলি, আমায় আজই হয়তো হয়ে যেতে হবে অলৌকিক ট্রেনের যাত্রী। সহকর্মীরা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখি এক সহকর্মী-(যার নাম আর আমার নাম অভিন্ন) আমাকে আগলে রেখে দোয়া করছেন আর ফুঁ দিচ্ছেন। তবে কি রাব্বুল আলামিন তার প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে ট্রেনটির গতি শ্লথ করে দিলেন?
ট্রেনে ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার রেওয়াজ আছে পাশ্চাত্যের দেশে দেশে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কবরে ঢুকবার জন্য পছন্দসই জমি কিনে রাখা হয়। শংকর রচিত ভ্রমণকাহিনিতে আছে : গোরস্থানের এজেন্ট বলছেন, ‘স্যার এই প্লটটা নিন। চমৎকার কবর হবে। আরামে থাকবেন। মূল্য মাত্র আট হাজার ডলার।’ সম্ভাব্য ক্রেতা (বয়স ৮৫) বলেন, ‘গাছ কোথায়! ছায়া আসবে কোথা থেকে? গরমকালে সূর্যতাপ সোজা এসে আঘাত হানবে কবরে। গরমে যে সেদ্ধ হয়ে যাব। আট হাজার ডলারে আমি নিজেকে সেদ্ধ করবার জন্য ডেকচি কিনতে এসেছি ভেবেছেন?’
মহান সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর অলৌকিক ট্রেনে সহজে সওয়ার হওয়ার উপায় বাতলে দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়া একটা সেতু। এটা পার হয়ে যেয়ো। এর উপর কোনো বাড়িঘর বানিয়ো না।’
লেখক : সাংবাদিক