আর ক’দিন পরই ঈদ। এর কয়েক দিন পরই বৈশাখ। ঈদ ও বৈশাখী অনুষ্ঠানে নারীদের অন্যতম আর্কষণ হাতে বোনা নকশী কাজ করা জামদানি শাড়ি। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মসলিন শাড়ি কাপড়ের ধারক ও বাহক হিসাবে আজও টিকে আছে এ জামদানি শাড়ি। এইসব উৎসব সামনে রেখে বাড়তি আয়-রোজগারের আশায় বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ায় অবস্থিত জামদানি পল্লী ও এর আশপাশের কয়েক গ্রামের ৫ হাজার তাঁতী। জামদানি শাড়ি বুনতে প্রতিদিন ভোর রাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
বাংলাদেশের ঐতিগ্যবাহী মসলিন শাড়ি কাপড়ের ধারক ও বাহক হিসাবে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে জামদানি শাড়ি। নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জ ও পাশবর্তী সোনারগাঁ উপজেলার ৪০টি গ্রামে রয়েছে জামদানি তাতীদের অবস্থান। জামদানি শিল্পকে এগিয়ে নিতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ২০ একর জমির রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার নোয়াপাড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে বিসিক জামদানি শিল্প নগরী। পুরো শিল্পনগরীতে ৪০৭টি প্লট আছে। প্রতি প্লটে অন্তত ৪/৫ টা করে তাঁত আছে। অনেক প্লটে ১০/১৫টি তাঁতও রয়েছে। জামদানি প্লটগুলিতে তাঁতিরা পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসও করেন। এখানে প্রায় দেড় হাজার তাঁতি নিয়মিত জামদানি শাড়ি তৈরি করেন।
একটি একটি করে সুতা গেঁথে নজরকাড়া নকশায় তৈরি করা হয় জামদানি। একটি শাড়ির সাথে অন্য একটি শাড়ির খুব একটা মিল নেই। আর এ কারণে জামদানি শাড়ি অনন্য। জামদানি শাড়ির পাশাপাশি থ্রি পিছ ও পাঞ্জাবীর পিছ ও তৈরী হয় জামদানি তাতেঁ। একটি শাড়ি তৈরি করতে সাধারণত এক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে নকশার উপর ভিত্তি করে কোন কোন শাড়ি তৈরি করতে ১৫ দিন, একমাস, ২ মাস কিংবা ৬ মাসও লাগে। কোয়লিটির উপর ভিত্তি করে জামদানি শাড়ির মূল্য ৫ হাজার থেকে শুরু করে এক/দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তাঁতি আলমগীর হোসেন বলেন, ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের সময় পারিবারিকভাবে খরচ আমাদেরও বেড়ে যায়। ঈদে পরিবারের লোকজনদের জন্য কেনাকাটা করতে হয় তাই বাড়তি রোজগারের আশায় আমরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছি।
মৈকুলী এলাকার জামদানি তাঁতি মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা জামদানি তাঁতি হলেও আমার ২ মেয়ে এক ছেলে সবাই পড়াশোনা করে। সারা বছর জামদানি শাড়ি বিক্রি করে কোন মতে সংসার চালাই। ছেলেমেয়েদের লেখাপাড়া ও সাংসারিক বিভিন্ন খরচ মেটাতে বাড়তি রোজগারের আশায় ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে বেশি সময় দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে শাড়ি তৈরি করি। এতে আমাদের বাড়তি একটা আয় হয়।
প্রতি শুক্রবার ভোর রাতে জামদানি পল্লীতেই জামদানির হাট বসে। সারা সপ্তাহ ধরে তৈরি হওয়া শাড়িগুলি তাঁতিরা এ হাটে বিক্রি করেন। সারা দেশ থেকে ব্যবসায়ীর এ হাট থেকে জামদানি কেনেন। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক খুচরা ক্রেতাও এ হাট থেকে জামদানি কেনেন। তবে বর্তমানে নোয়পাড়ার জামদানি পল্লীর প্রবেশ মুখে জামদানি কেনা বেচার অনেক দোকান হয়েছে। এসকল দোকানের ব্যবসায়ীরা তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি জামদানি কিনে থাকেন। ক্রেতারা এখান থেকে সারা বছর যেকোন সময় জামদানি কিনতে পারেন।
ময়মনসিংহের দিঘারকান্দা থেকে জামদানি কিনতে আসা নাছরিন সুলতানা জানান, তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি জামদানি কিনলে টাটকা জামদানি পাওয়া যায় এবং দামও কম পড়ে। তাই জামদানি পল্লীতে এসেছি জামদানি কিনতে।
ঢাকার ডেমরা থেকে আসা জাপান প্রবাসী সাফা বেগম জানান, ঈদ করতে ৩ দিন আগে জাপান থেকে দেশে এসেছি। ঈদে আমার জন্য জামদানি আর আমার স্বামীর জন্য জামদানি পাঞ্জাবী কিনেছি। আর এখান থেকে কেনাতে মার্কেটের চেয়ে অনেকটা কম দামে কিনতে পেরেছি। এছাড়া জামদানি তাঁতিরা কিভাবে জামদানি তৈরি করে এ পল্লীতে সরাসরি সেটাও দেখতে পেয়ে আনন্দ পেয়েছি।
জামদানি পল্লীর ব্যবসায়ী মোঃ মতিন মিয়া জানান, ঈদকে সামনে রেখে তাঁতিদের পাশাপাশি আমরাও ব্যস্ত সময় পার করছি। পূর্ব পরিচিতি ও অনলাইনের কল্যাণে হাজার হাজার জামদানি ক্রেতা এখান থেকে সুলভ মূল্যে জামদানি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আর এতে করে ক্রেতারা টাটকা শাড়ি পাচ্ছেন ও লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া এ পল্লী থেকে অনেক ক্রেতা জামদানির পাশাপাশি কমদামে থ্রি পিছ ও পাঞ্জাবী পিছও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল