জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরে সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে সাগরিকায় বেড়েছে শীতের প্রকোপ। কিন্তু গ্যালারিতে দর্শকদের কপালে ঘাম। রংপুর রাইডার্স-চিটাগং কিংসের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ উপভোগ করতে করতে শীতের কথা ভুলেই গেলেন তারা। শুধু গ্যালারিই তো নয়, স্টেডিয়ামের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা সাগরিকা ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে শত শত দর্শকও বিপিএলের ম্যাচ উপভোগ করলেন বিনা টিকিটে।
রংপুর রাইডার্সের পাকিস্তানি বোলার আকিফ জাভেদ ঘণ্টায় ১৪৫.২ কিলোমিটার গতিতে বলটা করলেন। চিটাগং কিংসের পাকিস্তানি ব্যাটার মোহাম্মদ ওয়াসিম পুরোপুরিই পরাস্ত হলেন। বলের লাইন মিস করলেন। স্ট্যাম্প ওড়ে গেল। নিবু নিবু করে জ্বলতে থাকা চিটাগং কিংসের আশার প্রদীপ যেন দপ করেই নিবে গেল! পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুতই ঘটল। চিটাগং কিংসের ইনিংস শেষ হলো ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৩১ রানে। রংপুর রাইডার্স ম্যাচটা জিতল ৩৩ রানে। টানা আট ম্যাচ জিতে ১৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে বিপিএলের শীর্ষ চার নিশ্চিত করে নিলেন নুরুল হাসান সোহানরা। দলটার সামনে এবার শীর্ষ ২ নম্বরে থাকার লড়াই।
গতকাল চিটাগং কিংসের সমর্থকরা সাগরিকা স্টেডিয়ামের গ্যালারির বেশির ভাগ আসনই দখল করে নেন। সন্ধ্যা ৭টার ম্যাচ শুরু হতেই গ্যালারি থেকে দলের সমর্থনে গর্জে উঠেন তারা। চিটাগং কিংসের সমর্থকদের গর্জনে নড়বড়ে হয়ে যায় রংপুর রাইডার্সের ব্যাটিং লাইন। চলমান বিপিএলে আগের সাতটি ম্যাচেই দুরন্ত ব্যাটিং করেছেন নুরুল হাসান সোহানরা। আগে কিংবা পরে যখনই ব্যাটিং করেছেন, প্রতিপক্ষের বোলারদের দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন। তবে গতকাল ইনিংসের শুরুর দিকে চিটাগং কিংসের বোলারদের সামনে দাঁড়াতে পারেননি তারা। ওপেনার তৌফিক খান ১০ বলে ৫ রান করে এলিস ইসলামের বলে মিড অফে মোহাম্মদ ওয়াসিমকে ক্যাচ দিয়ে মাঠ ছাড়েন। সাইফ হাসান ১৮ বলে ২টি চার মেরে ১৭ রান করে এলিস ইসলামের বলে এলবিডব্লিউয়ের শিকার হন। এমনকি রিভিউ নিয়েই বাঁচতে পারেননি তিনি। ইফতিখার আহমেদ ৫ বলে ৩ রান করে আরাফাত সানির বলে স্ট্যাম্পিংয়ের শিকার হন। রংপুরের আমেরিকান ওপেনার স্টিভেন টেইলর এক পাশ আগলে রেখেছিলেন। তিনিও ৩২ বলে ৩৯ রান করে নাইম ইসলামকে ফিরতি বলে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। ১টি চার ও ৩টি ছক্কা হাঁকান টেইলর। এরপরই সাগরিকায় চিটাগং কিংসের সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেন পাকিস্তানের খুশদিল শাহ। রংপুর রাইডার্সের সমর্থকদের গর্জন শোনা যায় বেশ কিছু সময়। নুরুল হাসান তাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। তিনিও ১০ বলে ৮ রান করে মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। এরপর শেখ মেহেদি হাসানকে সঙ্গে নিয়ে রানের গতি ঠিক করেন খুশদিল। তিনি ২৮ বলে ৭টি ছক্কা ও ২টি চারের মারে ৫৯ রান করেন। খুশদিলের ঝোড়ো ইনিংসেই লড়াইয়ের পুঁজি সংগ্রহ করে রংপুর রাইডার্স। শেষদিকে শেখ মেহেদি ১২ বলে ১৭ রান করে রানের সংখ্যা কিছুটা বাড়িয়ে নেন। মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ৮ রানে অপরাজিত থাকেন। রংপুর রাইডার্স ৭ উইকেটে ১৬৪ রান সংগ্রহ করে।
ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও দারুণ ভূমিকা রাখেন খুশদিল শাহ। মাত্র ২৩ রানে শিকার করেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। ব্যাটে-বলে অলরাউন্ড পারফর্ম করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জয় করেন তিনিই। তবে চিটাগং কিংসের ইনিংসে ধস নামাতে বড় ভূমিকা রাখেন আরেক পাকিস্তানি বোলার আকিফ জাভেদ। তিনি ৩২ রানে ৪ উইকেট শিকার করেন। চলমান বিপিএলে মোট ১২ উইকেট শিকার করে দুই নম্বরে আছেন তিনি। ১৬ উইকেট নিয়ে শীর্ষে তাসকিন। চিটাগং কিংসের পক্ষে গতকাল সর্বোচ্চ ৩৮ রান করেন শামীম হোসেন। এ ছাড়াও পারভেজ ২৬ ও গ্রাহাম ২৩ রান করেন। নাঈম ১৯ রানে আউট হন। চিটাগং কিংস ৬ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে ৩ নম্বরে নেমে গেছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
রংপুর রাইডার্স : ১৬৪/৭, ২০ ওভার (তৌফিক খান ৫, স্টিভেন টেইলর ৩৯, সাইফ হাসান ১৭, ইফতিখার আহমেদ ৩, খুশদিল শাহ ৫৯, নুরুল হাসান ৮, মেহেদি হাসান ১৭, সাইফউদ্দিন ৮*। বিনুরা ফার্নান্দো ৪-০-১৪-১, মারুফ মৃধা ৪-০-৩৬-০, এলিস ইসলাম ৪-০-২৮-২, মোহাম্মদ ওয়াসিম ৪-০-৪২-২, আরাফাত সানি ৩-০-৩৬-১, নাইম ইসলাম ১-০-৪-১)।
টিটাগং কিংস : ১৩১/৮, ২০ ওভার (পারভেজ ইমন ২৬, গ্রাহাম ক্লার্ক ২৩, শামীম হোসেন ৩৮, নাইম ইসলাম ১৯। রাকিবুল হাসান ৩-০-১৫-১, মেহেদি হাসান ৪-০-২৫-০, আকিফ ৪-০-৩২-৪, মো. সাইফুদ্দিন ১-০-১২-০, ইফতিখার আহমেদ ৪-০-২২-১, খুশদিল শাহ ৪-০-২৩-২)।
ফল : রংপুর রাইডার্স ৩৩ রানে জয়ী। ম্যাচসেরা : খুশদিল শাহ