ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দল। বিশ্ব সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমাতে নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, চিকিৎসা পেতে বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে স্বৈরাচারী সরকার। মূলত ক্ষমতায় টিকে থাকতে আন্দোলনকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল জেনেভায় এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ।
সংস্থাটি জানায়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। সে অনুযায়ী পূর্ববর্তী সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা একত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে পদ্ধতিগতভাবে শতাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যা, অত্যধিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে হাজারো আন্দোলনকারীকে গুরুতর আহত করা, নির্বিচারে আটকে রাখতে স্বেচ্ছাচারিতা, নির্যাতনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সজ্ঞানে, সমন্বয় ও নির্দেশনায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে পুরো পুলিশ বাহিনী, আধা-সামরিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর সহিংসতা ও নির্যাতন পরিচালনা করেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমানভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেন, এ নৃশংস প্রতিক্রিয়া ছিল সাবেক সরকারের একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত কৌশল, যা জনতার বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। বিক্ষোভ দমন করার কৌশলের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে, তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, ব্যাপক নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে সাক্ষ্য এবং প্রমাণ সংগ্রহ করেছি তা ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকান্ডের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর এবং যা আন্তর্জাতিক অপরাধও গঠন করতে পারে। জাতীয় নিরাময় এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য দায়বদ্ধতা এবং ন্যায়বিচার অপরিহার্য।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে। নিহতের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশই শিশু। এদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো সামরিক অস্ত্র ও শটগানের গুলিতে মারা যান। হাজারো ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। ১১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষকে র্যাব ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর এসকেএস, টাইপ-৫৬ ও বিডি-০৮ বন্দুক দিয়ে ৭.৬২ এমএম গুলি চালানোর প্রমাণ পেয়েছে তথ্যানুসন্ধান দল। জাতিসংঘ বলছে, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা অতিরিক্ত বল প্রয়োগে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন। ১৮ জুলাই কোর কমিটির বৈঠকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবিকে আন্দোলনকারীদের ওপর আরও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া আরেকটি কোর কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে আন্দোলনকারীদের সরাতে বেআইনি মারণাস্ত্র ব্যবহারের সবক দেন। ১৯ জুলাই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে খোদ শেখ হাসিনা আন্দোলনের সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করে, মেরে ফেলে, লাশ গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ছাত্রনেতাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করতে অনুমোদন দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার মাঠে সেনাবাহিনী নামিয়েছিল অন্য বাহিনীর মনোবল বাড়াতে। অন্য বাহিনী যখন নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করছিল, তখন তারা তাদের সুরক্ষা দেয়নি। এদিকে আন্দোলন দমনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, ডিবি, এসবি, সিটিটিসির মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্দোলনকারীর সহিংস দমনে সরাসরি জড়িত থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। গোয়েন্দা বাহিনীগুলো শিশুসহ নির্বিচারে আটক, গুম, নির্যাতন, তথ্য বের করা, স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গণমাধ্যমকে পুরো সত্য প্রকাশে বাধা দিয়েছে।
র্যাব ও এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করাসহ ৪৪ সুপারিশ : জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং সমস্যার মূল উৎস খুঁজে বের করতে পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪৪টি সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে জবাবদিহি এবং বিচার বিভাগের জন্য ১৩টি, পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগের জন্য ১০টি, নাগরিক পরিসরে ৮টি, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ৫টি এবং অর্থনৈতিক সুশাসনে ৪টি সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি র্যাব ও এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হলে সত্যিকার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার পথ রুদ্ধ হবে। অবাধ ও সত্যিকারের নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভোটের আগে সব রাজনৈতিক দল যেন সমান প্রচারণার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা এবং বিচার বিভাগের সংস্কার করতে বলেছে জাতিসংঘ। সর্বোচ্চ দন্ড হিসেবে মৃত্যুদন্ড বাতিলের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।