রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। তাঁরা জানান, সংবিধানের যে কোনো সংশোধন হচ্ছে জাতীয় সংসদের একচ্ছত্র অধিকার। পাশাপাশি সংস্কার কমিশনের ‘গণভোট’ পদ্ধতিকেও তাঁরা সাধুবাদ জানান। সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট দরকার। ১৫ জানুয়ারি সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদন নিয়ে শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যে ওই বৈঠক হওয়ার কথা।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে রাষ্ট্রের মূলভিত্তি সংবিধানের সংস্কারে গঠিত কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, দেশের সাংবিধানিক নাম এবং সংসদীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের মতো সুপারিশ রয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হবে নিম্নকক্ষ জাতীয় সংসদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) এবং আরেকটি উচ্চকক্ষ (সিনেট)। উভয় কক্ষের মেয়াদ হবে চার বছর। আর একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী দুবারের বেশি হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এ ছাড়া সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।
সংস্কার সুপারিশ কোন পথে বা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে সে প্রশ্নে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংবিধানের যে কোনো সংশোধন হচ্ছে জাতীয় সংসদের একচ্ছত্র অধিকার। যখন নির্বাচিত জাতীয় সংসদ হবে তখন দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে যেগুলো পাস হবে সেগুলো সংশোধন হবে। কোনটা পাস হবে, কোনটা পাস হবে না, সে সিদ্ধান্ত হবে আগামী জাতীয় সংসদে।’
সংবিধান সংস্কারে গণভোট প্রসঙ্গে কমিশনপ্রধান আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়টিকে এভাবে দেখি-রাজনৈতিক ঐকমত্য যখন তৈরি হবে, তখন একটা পথও বেরিয়ে আসবে। যেমন একটা পথ হতে পারে সংবিধানসভা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে সংবিধানসভা হতে পারে। আবার রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে, তারা এ ব্যাপারে একটি সনদ তৈরি করে নির্বাচন করবে এবং পরবর্তী সংসদে সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধান পুনর্লিখন কিংবা পরিবর্তন করবে; সেটিও হতে পারে। নির্বাচনের আগে এটি করা হোক, আর পরে করা হোক না কেন, একটি গণভোট করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে গণভোটের পক্ষে। কারণ, এর জন্য জনগণের ম্যান্ডেট দরকার।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব দিয়েছে তা পাস করতে পারবে আগামী জাতীয় সংসদ। সংবিধানসহ যে কোনো বড় ধরনের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার বিপক্ষে আমি নই। সে ধরনের একটি মেকানিজম সংবিধানে থাকলে ভালো বলে মনে করি। পার্লামেন্ট গঠন করার পর সে ক্ষমতা আসবে। কমিশন যেসব সুপারিশ দিয়েছে তা মানা ম্যান্ডেটরি নয়। যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা যদি মনে করেন এসব সুপারিশ গ্রহণ করবেন না তাহলে করবেন না।’
একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘যে কোনো সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের জন্য সংসদ থাকতে হয়। আগে ১৪২ ধারায় ছিল যে, কোনো সংশোধনের জন্য আগে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর গণভোটের জন্য পাঠানো হবে। অর্থাৎ প্রথমে সংসদের মেজরিটি মতামত নিতে হবে, তারপর গণভোটের প্রশ্ন আসবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু গণভোটের প্রেক্ষাপট দিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়। সংসদ থাকতেই হবে। সারা পৃথিবীতে যারা লিখিত সংবিধান মানে তাদের কিছু নিয়ম মেনে করতে হয়।’