গভীর জঙ্গলে এক অদ্ভুত বাড়ি। এটি একেবারে আলাদা, এমনকি দূর থেকেও চোখে পড়ার মতো। বাড়িটির দেয়ালগুলো ছিল হীরে দিয়ে মোড়া, যেন সূর্যের আলো এসে পড়লেই পুরো পৃথিবী আলোয় ভরে যায়। ঝকঝক করা এই হীরে দিয়ে তৈরি বাড়ি দেখে প্রথমবার যে কেউ আসবে, তার মনে এক ধরনের অদ্ভুত ভয় এবং আগ্রহ সৃষ্টি হবেই। গ্রামের লোকজন মাঝেমধ্যেই সেই বাড়ি সম্পর্কে নানা ধরনের গল্প বলত। কেউ বলত, সেই বাড়িতে এক ভয়ংকর দৈত্য বাস করে, কেউ বলত, বাড়িটি অভিশপ্ত। তবে রাজু নামের ছোট্ট এক ছেলে এসব গল্পে বিশ্বাস করত না। তার মনে ছিল এক গভীর কৌতূহল এবং সাহস।
রাজু ছিল একেবারে সাহসী ছেলে, সবসময় নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য আগ্রহী। সে জানত, যেগুলো ভয়ংকর মনে হয়, সেগুলো হয়তো আসলে তেমন কিছু না। আর তার সবচেয়ে বড় বন্ধু মিতু ছিল বেশ ভীতু। সে একেবারেই রাজুর মতো সাহসী নয়। তবে রাজু যখনই তার কোনো নতুন অভিযান শুরু করত, মিতু কিছুটা ভয় ভেঙে তার সঙ্গে চলে আসত। এক দিন রাজু সিদ্ধান্ত নিল, হীরের বাড়ি দেখতে যাবে। মিতু তাকে অনেক বুঝিয়ে বলেছিল, ‘রাজু, ওই বাড়িতে গিয়ে কী করবি? আমি তো একবারও যেতে চাই না!’ কিন্তু রাজু বলল, ‘তুমি ভয় পেও না। আমরা সবাই একসঙ্গে যাব। দেখতে হবে, এটা আসলেই ভয়ংকর কিছু কি না।’
পথে বেরিয়ে রাজু আর মিতু নানা ধরনের গল্প করতে করতে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে চলে আসে হীরের বাড়ির কাছে। বাড়ি যখন তাদের চোখের সামনে পড়ল, তখন মিতু একটু থেমে গেল। ‘রাজু, এ তো একদম ভিন্ন কিছু! কী বিশাল, কী সুন্দর!’ মিতু হতবাক হয়ে বলল। রাজু একটু হাসল এবং বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির দেয়ালগুলো হীরে মোড়া, এমনকি দরজা পর্যন্ত সোনালি। রাজু ভাবল, এ বাড়ি কি সত্যিই হীরের? তার সব সন্দেহ আর কৌতূহল যেন বাড়ি দেখেই উধাও হয়ে গেল।
‘এটা কি আসলেই দৈত্যের বাড়ি?’ মিতু আবারও প্রশ্ন করল।
রাজু উত্তেজনায় বলল, ‘আমরা যাচ্ছি দেখে আসব। যদি কেউ থাকে, তবে তাকে জিজ্ঞেস করব।’
দরজার কাছে গিয়ে রাজু ধীরে ধীরে হাত রেখে দরজাটা ঠেলল। এক মুহূর্তে দরজা খুলে গেল, আর ভিতরে ঢুকল দুজন বন্ধু। ঢোকার পর দেখতে পেল, ভিতরে সব কিছু যেন স্বর্ণময়। মেঝে ছিল সোনা দিয়ে মোড়া, দেয়ালে ঝুলছে হীরে-মুক্তা। এমন একটা দৃশ্য যে কেউ প্রথমবার দেখবে, তার চোখ আর মুখ চমকে উঠবেই। তবে, একে অপরকে সাহস দিয়ে তারা এগিয়ে চলল।
হঠাৎ এক বিকট আওয়াজ শুনে তারা ভীত হয়ে গেল। একটি বড়ো পদক্ষেপের শব্দ আসছিল। রাজু বলল, ‘এই তো, দেখতে হবে কে আসছে!’ কিছুক্ষণ পর এক বিশাল দৈত্য তাদের সামনে উপস্থিত হলো। দৈত্যটি এত বড় যে তার মাথা ছাদ স্পর্শ করছে। তার গায়ে সোনালি চেইন ঝুলছিল, চোখে গম্ভীর ভাব। মুখে কৃপণ হাসি, যেন কিছু ভাবছে।
‘তোমরা কে? এখানে কী করছ?’ দৈত্যটি রুক্ষ গলায় প্রশ্ন করল।
রাজু একটু সাহস নিয়ে বলল, ‘আমরা এখানে হীরের বাড়ি দেখতে এসেছি। শুনেছি এখানে আপনি থাকেন। কিন্তু আমরা আপনাকে ভয় পাই না।’
দৈত্যটি প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হাসি হেসে বলল, ‘ভয় পেও না। আমার নাম হীরাবান। এই বাড়ি আমি একা তৈরি করেছি। কিন্তু কোনো বন্ধু পাইনি, সবাই আমাকে ভয় পায়। তোমরা এখানে কেন এসেছো?’
রাজু ও মিতু অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। রাজু বলল, ‘তাহলে আপনি তো খুব একা হয়ে গেলেন। সবাই আপনাকে ভয় পায়?’
হীরাবান মাটির দিকে তাকিয়ে একটু মন খারাপ করে বলল, ‘হ্যাঁ, কারণ আমি এক বিশাল দৈত্য। আমার শক্তির জন্য সবাই আমাকে ভয় পায়। কিন্তু আমি তো কিছু খারাপ করি না। আমি চাই, আমার জীবনটা অর্থপূর্ণ হোক।’
রাজু ভাবল, ‘এটা তো খুব অদ্ভুত। এত বড় শক্তি আর সম্পদ থাকার পরও এত একা কেন?’
রাজু আবার বলল, ‘আপনি কি আমাদের মতো ছোটদের সাহায্য করতে চান? আপনি যদি এই হীরে দিয়ে স্কুল বানাতেন, তাহলে অনেক শিশুর উপকার হতো। আপনি তাদের বন্ধু হতে পারতেন।’
হীরাবান প্রথমে একটু অবাক হয়ে ভাবল, তারপর বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছো, রাজু। আমি তো এতদিন ভাবিনি। তবে কীভাবে শুরু করব?’
রাজু বলল, ‘সব কিছু একে একে শুরু করা যায়। প্রথমে আপনি গ্রামের মানুষদের জানান, তারপর তারা সাহায্য করবে।’
এরপর হীরাবান নিজের হীরে দিয়ে একটি বড় স্কুল তৈরি করল। গ্রামের ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়তে আসল। গ্রামের লোকজন প্রথমে খুব অবাক হয়েছিল। কিন্তু যখন তারা দেখল, হীরাবান কোনো ক্ষতি করতে চায় না, তখন তারা তার প্রতি মনোভাব বদলে ফেলল। তার বিশাল বাড়ি, হীরের ঝলমলে দেয়ালগুলো, তার শক্তিশালী শরীরে এসব কিছুই আর ভয়ংকর মনে হচ্ছিল না।
রাজু এবং মিতু তাদের নতুন বন্ধু হীরাবানের সঙ্গে সময় কাটাতে লাগল। তাদের খুশি দেখে হীরাবানও একসময় ভাবতে শুরু করল, সত্যিই বন্ধুদের জন্য জীবনে কিছু করতে পারলে জীবন আরও সুন্দর।
গ্রামের বাচ্চারা এখন আর হীরাবানকে ভয় পেত না। তারা জানত, দৈত্যটা একেবারে ভালো। আর সে, যে এত বড় শক্তি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল, তার হাতে আরও অনেক কিছু করার ছিল। সে শুধু নিজের মনের দুঃখ দূর করতে চায়নি, বরং পৃথিবীকে সুন্দর ও ভালো করতে চেয়েছিল।
এক দিন, হীরাবান রাজুকে বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছিলে, রাজু। বন্ধুদের জন্য জীবনে কিছু করার মতো বড় কিছু আর নেই।’
রাজু ও মিতু তার সঙ্গে খেলতে খেলতে হাসির সাথে বলল, ‘আপনি তো আমাদের সবচাইতে ভালো বন্ধু, হীরাবান।’
হীরাবান হাসল, ‘এখন আমি বুঝতে পারি, শক্তির সঙ্গে ভালোবাসাও গুরুত্বপূর্ণ।’
এভাবেই হীরের বাড়ি হয়ে উঠল শুধু একটি বাড়ি নয়, একটি সুখী স্কুল, যেখানে শিশুরা শিখে, হাসে এবং বেড়ে ওঠে। আর হীরাবান তার একাকিত্ব কাটিয়ে জীবনের প্রকৃত আনন্দ পেল।