আলোচনা এবং জীবন ও কর্মের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে ১১০তম জন্মদিনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে স্মরণ করল বাংলা একাডেমি। গতকাল বিকালে একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন। এতে ‘জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলায় মানুষ ও সমাজচেতনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক আবদুস সাত্তার। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ নিজার। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব মোহা. নায়েব আলী। অধ্যাপক আবদুস সাত্তার বলেন, জয়নুল যেমন তাঁর চিত্রকলায় সৌন্দর্যের সন্ধান করেছিলেন, তেমনি যা সুন্দর নয় তাকেও তিনি উপস্থাপন করেছিলেন। জীবনের সুন্দর প্রতিষ্ঠায় যে শক্তি বিরোধিতা করে তিনি তাকেও চিহ্নিত করেছেন। তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা ঔপনিবেশিক চেতনালালিত অভিজাত নাগরিকদের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। পাকিস্তান শাসনামলে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি পূর্ব বাংলার ঢাকায় মানুষের জন্য শিল্প শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। প্রান্তিক মানুষের সৃষ্টিকর্মের গুরুত্ব ও মর্যাদা দানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প ফাউন্ডেশন। ময়মনসিংহে তার শিল্পকর্ম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন জয়নুল সংগ্রহশালা। যাতে রাজধানীর বাইরের মানুষরাও শিল্পের সৌন্দর্য আস্বাদন করতে পারেন।
সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং শৈল্পিক কুশলতা তাঁর চিত্রকলায় বিশিষ্টতা দান করেছে।
আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনে জয়নুল আবেদিনের অবদান অবিস্মরণীয়। লোকবাংলা প্রাণ পেয়েছে তাঁর রংতুলির ছোঁয়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারির সঙ্গে লড়াই আর স্বাধিকার স্বাধীনতার সংগ্রামে উদ্বেলিত জাতির প্রতিটি পর্ব জয়নুলের সৃষ্টিতে নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
তারা আরও বলেন, উত্তর প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে জয়নুল আবেদিন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কী করে একজন শিল্পী তাঁর ব্যক্তিগত সাধনা দিয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর শিল্পী হয়ে ওঠেন তা জয়নুলের কাছ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, জয়নুল আবেদিন তাঁর চিত্রগুচ্ছে মতান্তর ও জন-বিপন্নতা ধারণ করে তিনি দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় শিল্প-আধুনিকতা দিয়ে জয়নুল-চিত্রকলাকে যেমন ব্যাখ্যা করা যাবে না, তেমনি কলকাতার শিল্প-স্কুল দিয়েও হুবহু অনুধাবন করা যাবে না তাঁকে। জয়নুলের লড়াই ও অর্জন পূর্ববাংলার জনমানুষকে ঘিরেই মূলত আবর্তিত।