আল্লাহতায়ালা পরম দয়ালু। অসীম মেহেরবান। তিনি উদার ক্ষমাশীল। ক্ষমা তাঁর অন্যতম আদর্শ। ক্ষমা প্রার্থীর আবেদনের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। ক্ষমা করার জন্য বান্দাদের প্রদান করেছেন তিনি ক্ষমার সুবর্ণ সুযোগ আর বিশাল বিশাল অফার। এ মহা অফারগুলোর অন্যতম একটি হলো শবেবরাত।
আরবি বছরের অষ্টম মাস শাবান। এ শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে ফারসি ভাষায় শবেবরাত বলে। শব অর্থ রাত এবং বরাত অর্থ মুক্তি। এক কথায় ‘শবেবরাত’ মানে মুক্তির রজনি। এ রাতে পরম করুণাময় মুক্তি ও মাগফিরাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। তাই এর নাম ‘মুক্তির রজনি’ বা ‘শবেবরাত’।
বিজ্ঞজনদের গবেষণামতে, কোরআনে করিমে এ রাতকে ভাগ্যরজনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনের ভাষায় মহান আল্লাহ প্রতি বছর এ রাতে সৃষ্টিজগতের ভাগ্য বণ্টন করেন। তাই এর নাম ভাগ্যরজনি বলা হয়েছে। এ রাতটি শাবান মাসের ১৪ তারিখ তথা মধ্য শাবানের রাত। তাই হাদিসে এ রাতকে মধ্য শাবানের রজনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘকাল থেকে একটি চিহ্নিত মহল শবেবরাতের নামে বাসাবাড়িতে আলোকসজ্জা এবং পুষ্প অর্পণ করে, রাস্তাঘাটে আতশবাজি, ফটকাবাজি, সর্বত্র হালুয়া-রুটি ও মিষ্টি বিতরণের ধুমধামে মত্ত হয়ে যায়। অথচ এসব কর্ম শবেবরাতের মতো পবিত্র রজনিতে কেন, যে কোনো সময় তা গর্হিত কাজ, শরিয়ত পরিপন্থি। ইসলামি শরিয়তে এ ধরনের কুসংস্কারের আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। নেই সাহাবায়ে কেরাম ও নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের অনুসৃত আমলে এর বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব। এসব ইসলামের নামে নিছক বাড়াবাড়ি।
পক্ষান্তরে সাম্প্রতিককালে অপর একটি মহল এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। তারা বাড়াবাড়ির চরম সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। শবেবরাত শিরক, বিদআত, হারাম, জায়েজ নেই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারে তারা খুবই অভ্যস্ত। শবেবরাত পালনে অতি উৎসাহীদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা শরিয়তের বাস্তব অবস্থাটা বিকৃত করতে শুরু করেছে। তারা কোরআন-হাদিস ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত হচ্ছে। শবেবরাতের ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কিত বিশুদ্ধ হাদিসকে তারা আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করে না।
বাড়াবাড়ির ও ছাড়াছাড়ির জালে আবদ্ধ এ দুটি মতবাদের মাঝামাঝি অবস্থানে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত। শবেবরাত পালনে তারা অতি উৎসাহীও না, কোরআন-হাদিসে প্রমাণিত শবেবরাতের ফজিলত বর্জন করারও তারা পক্ষে না।
মহিমান্বিত শবেবরাতের একাধিক ফজিলত পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে। আছে মুসলিম মনীষীদের উদ্ধৃতি ও আমলের অসীম গুরুত্ব। শবেবরাত একটি মহিমান্বিত রজনি। এ রজনিতে পরম করুণাময় তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। পাপীদের উদারচিত্তে ক্ষমা করেন। এ মর্মে একটি সহিহ হাদিস মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহতায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক, হিংসুক ও বিদ্বেষী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান-১২/৪৮১, হা.৫৬৬৫ তাবরানি, কাবির- ২০/১০৯ হা.২১৫, আওসাত-৭/৬৮ হা. ৬৭৭৬ বায়হাকি, শুয়াবুল ইমান- ৫/২৭২ হা. ৬৬২৮)।
এ হাদিসটি সম্পর্কে আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গবেষক ও মান্যবর ইমাম হাফেজ নূরুদ্দীন হায়সামী (রহ.) লিখেন, ‘এ হাদিসের বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।’ (মাজমাউজ যাওয়াইদ ৮/৬৫)।
উপরিল্লিখিত হাদিসটি উল্লেখ করার পর তিনি লিখেন, ‘হাদিসটি সহিহ, সাহাবায়ে কেরামের বিশাল অংশ বিভিন্ন সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যা একটি অপরটিকে সুদৃঢ় করে। তাঁরা হলেন- মুআয ইবনে জাবাল, আবু সা’লাবা আল খুশানি, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আশআরি, আবু হুরায়রা, আবু বকর ছিদ্দিক, আউফ ইবনে মালেক ও আয়েশা )রা.)।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা- ৩/১৩৫)।
শবেবরাতের ফজিলত ও করণীয়-সম্পর্কিত হাদিসের সংখ্যা এক ডজনেরও বেশি। শায়খ আলবানি শবেবরাত ভাগ্য বণ্টনের রাত, শবেবরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখা ইত্যাদি ফজিলত-সম্পর্কিত আটটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। প্রতিটি হাদিসের সঙ্গে তিনি হাদিসের মান নিয়েও আলোচনা করেছেন। সর্বশেষে শবেবরাত-সম্পর্কিত যাবতীয় হাদিসের মৌলিকভাবে মান বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেন, ‘শবেবরাত-সম্পর্কিত হাদিসের ক্ষেত্রে সার কথা হলো, শবেবরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো সমষ্টিগতভাবে নিঃসন্দেহে সহিহ। আরও কমসংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হাদিস সহিহ হিসেবে গণ্য হয়।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা ৩/১৩৮-১৩৯)। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আবদুর রহমান মুবারকপুরী এবং বিশ্ববরেণ্য হাদিস বিশারদ ইমামদের গবেষণামতে শবেবরাতের হাদিস সহিহ। আমলযোগ্য। গ্রহণযোগ্য। (ইকতিজা-৪৮৪, তুহফাতুল আহওয়াজি- ৩/৩৮৪)।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা