হাশরের ময়দানে সব মানুষের বিচার হবে। সবার জন্য শেষ এবং চূড়ান্ত বিচার হবে এখানে। সেদিন অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হবে যে সূর্য মানুষের মাথার মাত্র অর্ধ হাত ওপরে আসবে। আর পায়ের নিচের মাটি হবে জ্বলন্ত তামার। গরমের তীব্রতায় মানুষের মাথার মগজ টগবগ করবে, যেমন চুলার ওপর ভাতের হাঁড়ি টগবগ করে। এ কঠিন এবং ভয়াবহ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সাত প্রকারের বান্দাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মাঝে রহমতের শীতল চাদর বিছিয়ে দেবেন। দাউ দাউ করা দাবানলের গ্রাস থেকে প্রিয় বান্দাদের রক্ষা করবেন। সেই সৌভাগ্যবান সাত ব্যক্তি সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেন, সাত প্রকার মানুষকে আল্লাহতায়ালা তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।
১) ন্যায়পরায়ণ শাসক। অর্থাৎ এমন শাসক যিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেছেন। কারও ওপর জুলুম করেননি। নিজে ক্ষমতার ভুল ব্যবহার বা অপব্যবহার করেননি। কারও হক নষ্ট করেননি। আল্লাহর দেওয়া আমানত জনগণের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি বা দলপ্রীতি করেননি। এখানে শাসক বলতে শুধু শাসক নয়, বরং প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি। বাবা যেমন সন্তানের জন্য দায়িত্বশীল। স্বামী যেমন স্ত্রীর জন্য দায়িত্বশীল। গার্মেন্ট মালিক তার কর্মচারী-শ্রমিকদের জন্য দায়িত্বশীল। এভাবে যে কোনো ফ্যাক্টরির মালিক যেমন তার শ্রমিকদের জন্য দায়িত্বশীল। এভাবে দুনিয়াতে যে যার অধীনে আছে সে যদি অধীন ব্যক্তিদের প্রতি ইনসাফ করে থাকে, ন্যায়বিচার করে থাকে, তাহলে সে আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে। অনুরূপভাবে প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত তারাও যদি ন্যায়বিচার করে, জনগণের উপকার করে তাহলে এ হাদিসের আওতায় তারাও আসবে। যেমন সমাজের ডিসি, এসপি, ওসি, কমিশনার, মেয়র- তারাও যদি যার যার অধীন ব্যক্তিদের প্রতি জুলুম না করে থাকেন এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে তারাও আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবেন।
২) ওই যুবক, যার যৌবন কেটেছে আল্লাহর ইবাদতে। যুবক বয়সে সে তার সময় ও শক্তিকে ভালো কাজে ব্যয় করেছে। জনসেবা করেছে। কল্যাণকর কাজ করেছে। মানুয়ের উপকার হয় এমন সব কাজ করেছে। তাহলে সে-ও আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে।
৩) এমন মানুষ যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে। অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে এমন মনোযোগী যে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য অপেক্ষায় থাকে। মহান আল্লাহকে আবারও সেজদা করার জন্য উদগ্রীব থাকে। এমন ব্যক্তিও আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে।
৪) এমন দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসে। মহব্বত করে। তাদের সম্পর্কের মাঝে দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ থাকে না। আল্লাহর জন্যই পরস্পর ভালোবাসা পোষণ করে এবং এর ভিত্তিতেই তারা একত্র হয়। এরই কারণে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়। বর্তমানে তাবলিগ জামাত ও অন্য কিছু ইসলামি সংগঠন আছে, যারা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে কাজ করে না। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তারা একত্র হয় এবং বিচ্ছেদ হয়।
৫) এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী এবং বংশমর্যাদাপূর্ণ নারী খারাপ কাজ করার জন্য তার প্রতি আহ্বান করে; কিন্তু সে বলে দেয় যে আমি তো আল্লাহকে ভয় করি। অর্থাৎ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যেই পুরুষ একমাত্র আল্লাহর ভয়ে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।
৬) এমন ব্যক্তি যে গোপনে দান করে এমনভাবে যে তার বাম হাতও জানতে পারে না যে ডান হাত কী দান করল। অর্থাৎ সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান-অনুদান দেয়।
৭) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয় (বুখারি)।
প্রিয় পাঠক! এখানে একই ব্যক্তির মাঝে এ সাতটি গুণ থাকতে হবে এমনটি জরুরি নয়। বরং এ সাত প্রকারের কোনো এক প্রকারের মধ্যে যদি আমি, আপনি, আমরা শরিক হতে পারি, তাহলেই আমাদের জীবন সফল। আর যদি কারও মাঝে এই সাতটি বিশেষ গুণের সব কটি বা কয়েকটি গুণ একসঙ্গে পাওয়া যায় তাহলে তো সে মহাসৌভাগ্যের অধিকারী। আসুন, কেয়ামতের দিনে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভের জন্য এ আমলগুলো আমরা এখন থেকেই শুরু করি। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সেই সৌভাগ্য দান করেন। শেষ বিচারের দিনে তাঁর মহান সিংহাসন ও আরশের নিচে একটু ছায়া দান করেন। আমিন।
লেখক : খতিব, সমিতি বাজার মসজিদ, নাখালপাড়া, ঢাকা
বিডি প্রতিদিন/এমআই