সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল। শত শত বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক চিতিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদকে রক্ষা করে গেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ ম্যানগ্রোভ বন। জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের লোভ, অসচেতনতা, বাণিজ্যিক চাপ ও সরকারের তদারকির অভাবে বনটি আজ ক্ষত-বিক্ষত। কমে যাচ্ছে বনের গাছ। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক বন্যপ্রাণী। টিকে থাকার লড়াইয়ে জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারও। সব মিলিয়ে ইউনেস্কো ঘোষিত পৃথিবীর অন্যতম হেরিটেজ সুন্দরবন আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে।
বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ১০ হাজার ২৩০ বর্গকিলোমিটার বনের মধ্যে ৬ হাজার ৩০ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে, বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বনাঞ্চলটি এখন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতি বছর মধু আহরণের মৌসুম এলেই সুন্দরবনে একাধিকবার আগুন লাগে। মাইলের পর মাইল গাছ পুড়ে কয়লা হচ্ছে, মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী। বনটির ওপর বাণিজ্যিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় বনের সীমানাঘেঁষে তৈরি হচ্ছে একের পর এক কংক্রিটের স্থাপনা। বনের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এসব ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও গভীর রাতেও আলোর ঝলকানিতে নষ্ট হচ্ছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ। দিনরাত শব্দ করে চলছে নৌযান। প্লাস্টিক ও তেলদূষণে বনটির মাটি এবং পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
ঈদের দিন সরেজমিন দেখা গেছে, পর্যটকদের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী- পানির বোতল, খাবারের পাত্র, অপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী বনের যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবনে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ হলেও রিসোর্টগুলোতেই বিক্রি হচ্ছে চিপস, বিস্কুট, কোল্ডড্রিংস, জুসসহ প্লাস্টিকে মোড়া বিভিন্ন পণ্য। দিন শেষে বস্তাভর্তি বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সুন্দরবনের খাল ও নদীতে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বনের খালগুলোয় নিয়মিত বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। এ ব্যাপারে মোংলার চিলা এলাকার মৎস্যজীবী আনিস মোল্লা বলেন, আগে সুন্দরবনের খালে জাল টানলেই মাছ উঠত। এখন মাছ নেই। তাই অনেকে খালের পানিতে পোকা মারা বিষ ছড়িয়ে দেয়। এতে সব মাছ ভেসে ওঠে। সহজে ধরা যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মোংলা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ নামের সংগঠনের সমন্বয়ক মো. নূর আলম শেখ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সুন্দরবনের অস্তিত্ব ভয়াবহ হুমকিতে। এ মুহূর্তে অন্যতম একটি সমস্যা বিষ দিয়ে মাছ শিকার। এতে মাছের পোনা, পানিতে বসবাসকারী অন্যান্য জলজ প্রাণীরও মৃত্যু হচ্ছে। পুরো বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে বনবিভাগও জড়িত। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণায় সুন্দরবন-সংলগ্ন রূপসা, পশুর ও মোংলা নদীর ১৭ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সুন্দরবনে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু কেউ মানছে না। কারণ এটা দেখার কেউ নেই। পর্যটকরা নৌযানে বস্তা ভরে চিপস, বিস্কুট, কোল্ডড্রিংস নিয়ে যাচ্ছে। এগুলো খেয়ে প্যাকেট নদীতে ও খালে ফেলছে, যা জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে পুরো বনে ছড়িয়ে পড়ছে। পুরো উপকূলীয় এলাকায় একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা দরকার।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ সালের দিকে পশুর নদের প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। ১০ বছর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ মিলিগ্রামে। অথচ স্বাভাবিক মাত্রা হলো ১০ মিলিগ্রাম। ১০ বছরে সুন্দরবন এলাকায় তেলদূষণ বেড়েছে ছয় গুণের বেশি। গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবন-সংলগ্ন শিল্প কারখানা স্থাপন ও যান্ত্রিক নৌযান চলাচলের কারণে সুন্দরবনের গাছপালা, বন্য ও জলজ প্রাণীর ওপর বেশ প্রভাব পড়ছে। বনের বুক চিড়ে বয়ে চলা নদ-নদীর পানি ও মাটিতে দূষণ বাড়ায় আগের মতো আর গাছের চারা গজাচ্ছে না। পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর প্রজনন কমে গেছে। অনেক প্রাণী মারা যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ক্ষতির মুখে সুন্দরবন। ঝড় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবছর একাধিকবার তছনছ হচ্ছে বনটি। নদ-নদীতে বিপুল পরিমাণে পলি জমায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক নদীগুলো শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। সমুদ্রের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি বাড়ছে সুন্দরবনের নদী ও খালে। অতিরিক্ত লবণাক্ততায় মারা যাচ্ছে সুন্দরী গাছ। বীজ থেকে গজাচ্ছে না চারা। প্রতি বছর জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু হচ্ছে অনেক বন্যপ্রাণীর। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার ২০১০ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল সুন্দরবনে। তাতে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের ৭০ শতাংশ ভূমি সমুদ্রের উপরিভাগের মাত্র কয়েক ফুট ওপরে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিনিয়ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কমে আসছে রয়েল বেঙ্গলের প্রজনন ক্ষেত্র। এ ছাড়া পরিবর্তিত আবহাওয়া ও দূষণের কারণে বাঘের প্রজনন ক্ষমতাও কমছে। সুন্দরবনের পানি ও মাটি দূষণ ঠেকাতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।