ঢাকাই চলচ্চিত্রে নারী অভিনয় শিল্পীরা এখনো অবহেলিত রয়ে গেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা শুধু নায়িকা হন নায়কের সঙ্গে প্রেম করতে, বন বাদাড়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে আর গাইতে। এ ইন্ডাস্ট্রিতে বয়স হয়ে গেলে চরিত্রে প্রমোশন হয়, অভিজ্ঞতাতে নয়। নারীদের বেলায় সেটা অনেক বেশিই করুণ। এখানে অভিজ্ঞ হলে বেকার হতে হয়। আজকে যাদের ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিতে কোটি কোটি টাকার লগ্নি, একটা সময় তারাই এখানে ঘুরে বেড়াবেন গুরুত্বের অভাবে। গ্ল্যামার আর যৌবনের জৌলুস হারালে এখানে ভাবি থেকে ক্রমান্বয়ে মা-দাদি হয়ে যেতে হয়। যেসব চরিত্র তাদের দিয়ে করানো হয় তার জন্য চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর অভিনয় করা ববিতা-কবরী লাগে না। রোজকার সম্মানিতে পাওয়া যায় এমন বয়স্ক শিল্পীকে দিয়েই সম্ভব, এফডিসি পাড়ায় যাদের ‘এক্সট্রা’ বলা হয়। এটা অনুধাবন করতে পেরেই সিনিয়র অভিনেত্রীরা দূরে সরে আছেন চলচ্চিত্র থেকে। ভাবি, মা-দাদির চরিত্র দিয়েও যে সিনেমার প্রধান চরিত্র হওয়া যায় সেই ভাবনার ছায়া আমাদের সিনেমাতে বিরল। ‘আম্মাজান’ ছবিটি নায়কপ্রধানই। মান্নার পাগলাটে অভিনয় ছবিটিকে অনন্যতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ছবিতে প্রায় নির্বাক চরিত্রে অভিনয় করেও দেশের দর্শকদের কাছে ‘আম্মাজান’ খ্যাতি পেয়েছিলেন নন্দিত অভিনেত্রী শবনম। এরপর কোথায় সেই চরিত্র, যেখানে অভিনয় কিংবা গল্পের গুরুত্বে নায়িকা না হয়েও নারী প্রাধান্য পেয়েছে? ষাটের দশকে আমাদের চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে এখনো এ দেশের চলচ্চিত্রের নারী চরিত্রের এটিই একমাত্র চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে কবরী সারেং বৌ কিংবা ববিতা গোলাপী আর শাবানা বাংলার বধূ হয়ে এসেছেন কিন্তু সেখানেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি তারা। অথচ হলিউডের এলিজাবেথ টেলর, জেনিফার লোপেজ, সোফিয়া লরেন কিংবা বলিউডের সেই মাদার ইন্ডিয়া ছবির নার্গিস থেকে শুরু করে হালের গাঙ্গুবাই খ্যাত আলিয়া ভাটরা মূল চরিত্রে কাজ করে চলচ্চিত্রের মধ্যমণি হয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক লিমন আহমেদ যথার্থই বলেছেন, তার কথায়, স্বাধীনতার পর থেকেই এ দেশের নারীদের উন্নতি হয়েছে সবখানে। তারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছে, আকাশে বিমান নিয়ে উড়ে বেড়িয়েছে, পুলিশ-আর্মিতে ঢুকে জাতিকে সেবা করেছে, ব্যবসা-ব্যাংকে প্রবেশ করে করপোরেট দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে হাল যুগেও বদলায়নি এদেশের চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন। এখনো নারী প্রেমিকাই; আজকাল আর আমজাদ হোসেনের মতো কোনো নির্মাতার ছবিতে গোলাপীর দেখা মেলে না, কোনো সুন্দরী প্রতিবাদী হয় না সমাজের লোলুপ-রিক্ত চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে। এখন ‘অগ্নি’ নাম নিয়ে চলে দর্শক মাতানোর গল্প, সমাজ বা চেতনাকে মাতাতে পারে না। এখন সব ছবিতেই নারী চরিত্রগুলো ফ্যাকাশে। নায়িকারা হাজির হচ্ছেন সিনেমার গ্ল্যামার আর কাটতি বাড়াতে। নায়কের কোমর ধরে নাচেন, হাঁটেন, ঘুরে বেড়ান, নাকি নাকি কান্না করেন। বাকি যা করার নায়করা একাই এক শ করছেন। আমাদের সিনেমায় নারী চরিত্রগুলো কতটা দরিদ্র সেটা অনুধাবন করা যায় ববিতা, কবরী, সুচন্দা, শবনম, শাবনাজ, শাবনূর, মৌসুমী, পূর্ণিমা, পপিদের অনিয়মিত হওয়া দেখলেই। তারা প্রত্যেকেই যার যার সময়ে সেরাদের তালিকায় রয়েছেন। মানুষকে নাড়া দেওয়া ও সমাজে প্রভাব ফেলার মতো চরিত্র পেলে তাঁরা বাজিমাত করবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘তোর বাবার প্রতিশোধ নে বাবা’ কিংবা ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না সাগর’ টাইপের সংলাপ ছাড়া তেমন কোনো চরিত্র এদের হাতে পৌঁছায় না। স্বভাবতই চরিত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সিনেমার ওজন বাড়ানোর চেষ্টা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। হলিউডে ষাট বছর বয়সেও অভিনেত্রীরা সেরা অভিনেত্রী হয়ে অস্কার পাচ্ছেন। আর আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা মনের মতো চ্যালেঞ্জিং চরিত্র না পেয়ে চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকছেন। পার্থক্যটা এখানেই। শাবনূর-মৌসুমীরা নায়িকা হওয়ার কোটা পার হওয়ার পরই গুরুত্ব হারিয়েছেন। কিন্তু ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, ‘খায়রুন সুন্দরী’, ‘চার সতীনের ঘর’, ‘নিরন্তর’-এর সিনেমায় কী টিনএজ, জিরো ফিগার, সেক্সি লুক, ছোট কাপড়ের নাচে যোগ্যতা লেগেছিল? বা এ যোগ্যতাসম্পন্ন নায়িকারা কী পারছে ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, ‘খায়রুন সুন্দরী’, ‘চার সতীনের ঘর’, ‘নিরন্তর’-এর মতো সিনেমা উপহার দিতে? তবে নারীদের নায়িকা ভাবার বাইরে গিয়ে অভিনেত্রী ভাবার চর্চাটা কেন ইন্ডাস্ট্রি করছে না, সেই প্র্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। সর্বশেষে জনপ্রিয় কয়টি সিনেমার নাম- ‘আয়নাবাজি’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘শিকারী’, ‘নবাব’, ‘রাজনীতি’, ‘বসগিরি’। ছবিগুলোতে মনে দাগ কেটেছে কোন সিনেমার কোন নারী চরিত্রটি? বুকে হাত দিয়ে এর সদুত্তর হয়তো নির্মাতারাও দিতে পারবেন না। নায়িকারা এসব ছবিতে এসেছেন নায়ককে বিকশিত করতে, গল্পকে উপভোগ্য করতেই। তবে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবিতে মাহিয়া মাহিকে তৎপর সাংবাদিক হিসেবে আলাদা লেগেছে দর্শকদের। যদিও চরিত্রটির প্রয়োজনীয়তা ও এর বিকাশ নিয়ে আলাপ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। ধুমধাম ব্যবসা না করলেও তৌকীর আহমেদের ‘হালদা’ ছবিতে তিশা, দিলারা জামান, রুনা খানের চরিত্রগুলো প্রমাণ দেয় চরিত্র নিয়ে ভাবলেই নারীদের গুরুত্ব বাড়ানো যায় সিনেমায়। সংগ্রামী জীবন তো কেবল পুরুষের নয়, পুরুষের জীবনের পেছনেও নারীর অনেক সংগ্রাম থাকে। সিনেমা সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম। সিনেমা সমাজ বদলায়। কিন্তু আমাদের প্রায় ষাট বছরের চলচ্চিত্রে সমাজে প্রভাব ফেলার মতো নারী চরিত্র খুব বেশি নেই। শুধু গ্ল্যামারটাই বেচে খাওয়া হয়েছে। সহজ ভাষায়, সিনেমা নামক পণ্যের আকর্ষণীয় মোড়ক হয়েছেন নারীরা।
শিরোনাম
- আওয়ামী লীগের টাকার লোভে না পড়তে দলীয় নেতাদের হুঁশিয়ারি শামা ওবায়েদের
- ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না : গোলাম পরওয়ার
- কালশী ফ্লাইওভারে গাড়ির সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, দুই যুবক নিহত
- মিয়ানমারে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত
- দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা
- হাসিনার এক মন্তব্যে সংকটে মাদারগঞ্জের সমবায় সমিতি
- এখনো ফাঁকা বন্দরনগরী
- ৫ মিলিয়ন ডলারের ‘গোল্ড কার্ড’ ভিসা উন্মোচন করলেন ট্রাম্প
- ঐশ্বরিয়া আমার মেয়ে নয়, কেবল ছেলের বউ : জয়া বচ্চন
- মাদকসহ এয়ারপোর্টে আটক কানাডার অধিনায়ক
- ‘প্রয়োজনে জোটগতভাবে নির্বাচন করবে এনসিপি’
- ট্রাম্পের শুল্ক বৃদ্ধিতে আইফোনের দাম হতে পারে ৩ লাখ টাকা
- পর্দায় নয়, এবার সত্যিই বিয়ে করলেন শামীম হাসান সরকার
- ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ
- বগুড়ার কথিত মিনি জাফলং: স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীর প্রাণহানি
- তিন বন্ধু মোটরসাইকেলে ঘুরতে গিয়ে দুর্ঘটনা, একজন নিহত
- তুরস্ক–গ্রিস উপকূলে পৃথক নৌকাডুবিতে ১৬ জনের প্রাণহানি
- দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড চুক্তি স্বাক্ষর
- রড ও কাঠ দিয়ে স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর, স্বামী গ্রেফতার
- দিনাজপুর জিলা স্কুল এক্স-স্টুডেন্ট সোসাইটির যাত্রা শুরু
ঢাকাই চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র দুর্বল কেন
আলাউদ্দীন মাজিদ
প্রিন্ট ভার্সন

‘তোর বাবার প্রতিশোধ নে বাবা’ কিংবা ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না সাগর’ টাইপের সংলাপ ছাড়া তেমন কোনো চরিত্র এদের হাতে পৌঁছায় না। স্বভাবতই চরিত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সিনেমার ওজন বাড়ানোর চেষ্টা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন
এই বিভাগের আরও খবর