চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠার পর ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চ্যানেল আইয়ে যাত্রা শুরু করে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’-এ কাজ করেছিলাম কৃষককে ফসল বৈচিত্র্যে আগ্রহী করে তুলতে। ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ শুরুর আগেই আমাদের দীর্ঘদিনের গবেষণা ছিল কৃষকের পরিবর্তিত অবস্থা নিয়ে। আমরা দেখেছি কৃষক মাঠে ফসল উৎপাদনে অগ্রসর হচ্ছেন। কিন্তু আমরা দেখলাম কৃষক পিছিয়ে আছেন বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে। ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর মূল লক্ষ্যই ছিল কৃষককে দেশবিদেশের আধুনিক কৃষির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
এই তো সেদিনের কথা। আমি যেন মাঠের সে ডাক শুনতে পাই। হাড় জিরজিরে কৃষকের নীরব উচ্চারণ যেন আমার কান পড়তে পারে। মাঠে মাঠে ফসলহীনতা, মাঠে মাঠে কৃষকের লোকসানের গল্প। এই তো কয়েক দশক আগে। সংকটের ধরনটি ছিল অন্যরকম। সার, কীটনাশক, ঋণ আর বীজের সংকট নিয়ে পথ হাঁটেন কৃষক। এর বাইরেও কৃষকের বাতির গোড়ায় জমে থাকে অন্ধকার। খেতের ফসল খেতেই হাসে, ব্যবসায়ীর হাতে পড়লে তা হয়ে ওঠে উৎপাদকের বঞ্চনার গল্প। এ আখ্যান বহুকালের। তারপরও যেন সবার অজানা। কারও মুখ থেকে কথাগুলো এভাবে আসেনি। গত শতকের আশি-নব্বই দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাটি ও মানুষে হাকিম আলীর মৎস্যখামার, মিসেস জামানের মুরগির খামার কিংবা বাড়ির ছাদে কাজি পেয়ারার মতো অসংখ্য ছোট ছোট সাফল্যের গল্প আমার মতো করে দেখিয়েছিলাম, তা একসময় কৃষক খামারির খুব চেনা গল্পে পরিণত হয়। কৃষকের হাতে কিছু কৃষি কৌশল আসে, আসে না বাজার। নতুন অভিযাত্রার শুরুটি ছিল এখানেই।
কৃষকের বাজারের বঞ্চনা এক সুদীর্ঘ ও দুর্ভেদ্য এক সংকট। শুধু এই বঞ্চনার নিরসনের পথ খুঁজতেই আমরা হেঁটেছি বহু পথ। পৃথিবীর দেশে দেশে। জাপানের ‘জেএ’ জাপান অ্যাগ্রিকালচার অ্যাসোসিয়েশনের সুষম বাজার কাঠামো থেকে শুরু করে চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোতে।
কৃষিপণ্যই কি কৃষকের গলার কাঁটা? এ-ও কি সম্ভব? কেন আমাদের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি হবে না, কোথায় বাধা? সেই যে ২০০৪ সালে আমাদের অভিযান শুরু হলো কৃষিপণ্য রপ্তানির সংকট অনুসন্ধানের পথ খুঁজে, সে অভিযান দুই দশক পরেও অব্যাহত আছে। আমরা এই হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান নিয়েই পৃথিবীর দেশে দেশে নীতিনির্ধারকের দরজায় কড়া নেড়েছি আমাদের সংকট দূর করতে। বারবার গিয়েছি ইংল্যান্ডের হোলসেল মার্কেটগুলোতে, কথা বলেছি ডেফরা, Department for Environment Food and Fural Affiers-এর সঙ্গে ।
চট্টগ্রামে নাহার অ্যাগ্রোর আধুনিক খামারে উদ্যোক্তা রাকিবুর রহমান টুটুলের সঙ্গে কথা বলছেন লেখক
কখনো আমাদের নীতিনির্ধারকের ঘুম ভেঙেছে কখনো ভাঙেনি। বাজার সফলতা আসেনি।
সবাই যখন মনোযোগ রেখেছি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দিকে তখন দেখেছি বাজার সিন্ডিকেটের হোতারা বসবাস করছে সমাজের সবচেয়ে উঁচু স্তরে। সেখানে একজন কৃষকের হাত কখনো পৌঁছতে পারে না। চেষ্টা করেছি কৃষকের কণ্ঠকে উচ্চকিত করতে। কৃষক নিজের কথা নিজে বলতে শিখুক। কৃষকের নিজস্ব দর্শ্বন পৌঁছে যাক নীতিনির্ধারকের সর্বোচ্চ স্তরে।
আমাদের দুই দশকের কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে আমরা চৌষট্টি জেলার কণ্ঠস্বরে এমন বজ্রকঠিন সত্য খুঁজে পেয়েছি, যা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে আমাদের সব সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ওই মাটিঘেঁষা মানুষগুলো। সমাজের উঁচুতলায় যারা রাষ্ট্রক্ষমতা, করপোরেট পুঁজি আর মানুষকে জিম্মি করার কারবারে সিদ্ধহস্ত তারা আর যা-ই হোক, দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখছে না। বরং তারা নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে শুধু খাল কেটে কুমির আনছে।
যখন বেকারত্ব আমাদের প্রধান সমস্যা তখন বারবার মনে হলো, আমাদের শিক্ষিত নাগরিক সমাজকে উন্নাসিকতা থেকে ফেরাতে হবে মাটির দিকে। হাত দিতে হবে নতুন প্রজন্মের গোড়ায়। ২০১০ সালে বিশ^বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঠের কৃষির সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর অভিযান ‘ফিরে চল মাটির টানে’ শুরু হলো। একই সঙ্গে মাঠে গেল স্কুলের কোমলমতি শিশুরা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে মাটি ও ফসলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার বহু কর্মসূচি আছে। বাংলাদেশে ছিল না। আমাদের শিশুরা চিনতে শুরু করল মাটি ও ফসলের শক্তি।
একসময় বীজ, সার, কীটনাশকের সংকটে ভুগতেন কৃষক। সেই সময় পেরিয়ে এসে কৃষক নতুন উদ্যোগে মনোনিবেশ করতে শুরু করলেন। ফিরে চল মাটির টানের ঢেউ ছড়িয়ে গেল সবখানে। কক্সবাজারের রহিমউল্লাহ বিদেশ থেকে ফিরে কুলবাগান করে যে নতুন গল্পের জন্ম দিল, এই গল্প ছড়িয়ে গেল বাংলাদেশে। ফরিদপুরের কুল মফিজ থেকে শুরু করে একে একে কয়েক হাজার কৃষি উদ্যোক্তা। শরীয়তপুরের হযরত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রফিকুল, মতিউর, কিংবা আকবর, মাগুরার নাসির, সাভারের রাজিয়া সুলতানা, কুব্বাত হোসেন অভি, বান্দরবানের কামাল আহমেদের মতো উদ্যোক্তারা কৃষি সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন। এরই সঙ্গে বাংলাদেশের মাটিতে কুল, কমলা, আম, মাল্টা, পেয়ারার সঙ্গে বিদেশি সবজির চাষের এক বিপ্লব সৃষ্টি হলো।
এই বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হলো করপোরেট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বড় বড় কৃষি ইন্ডাস্ট্রি। এই শিল্পে প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সহায়তায় মৎস্য উৎপাদনের আরেক নতুন বিপ্লবের জন্ম হয়েছে।
ফিরে আসি আবার ২০০৪ সালে, যখন হৃদয়ে মাটি ও মানুষ শুরু হয়। একদিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ গিয়ে ফুল চাষের অসাধারণ সাফল্যচিত্র দেখি। এরও আগে যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী-পানিসারার দারিদ্র্যপীড়িত জনপদে ফুল চাষের নেতৃত্ব দেন শের আলী সর্দার ও আবদুুর রহিমের মতো উদ্যোক্তারা। সেই জনপদ এখন কৃষি সাফল্য, ফুলের সৌরভ আর দেশি পর্যটন শিল্পের এক অনন্য ক্ষেত্র।
২০০৪ সালে যখন হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের সূচনা সংগীত তৈরি হয়, তখনই মনে হয়েছিল কথাটি। আমাদের দেশের কৃষককে একটু খেই ধরিয়ে দিলেই তারা অসাধ্যকে সাধন করতে পারেন। সভ্যতাই আমাদের অহংকার। আমাদের সভ্যতার মূল বাহক কৃষি। কৃষিই আমাদের খাদ্যের উৎস কিংবা জীবনের প্রতিটি ছন্দের প্রধানতম শর্ত। সভ্যতার সূচনা শেষে পরিসমাপ্তি সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদনেরই গল্প। যখন দেখেছি, পৃথিবীতে পরিবেশ বিপর্যয়ের সুর বাজছে আর বাংলাদেশ সে বিপর্যয়ের চূড়ান্ত জায়গাতে, তখন খুব মনে হয়েছে নগর জীবনের সব সমৃদ্ধি ধুলামলিন হয়ে যাবে, যদি না আমরা এখানে অক্সিজেনের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে পারি। এর সঙ্গে নাগরিকদের কৃষির সঙ্গে বন্ধন গড়ে তোলার কাজটিও জরুরি। আজ শহরে শহরে ছাদে ছাদে সবুজের একটি স্তর গড়ে উঠেছে। যেন ঊর্ধ্বাকাশে সবুজের একটি আচ্ছাদন। এই আচ্ছাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার নগর কৃষক। তারা হৃদয়ে মাটি ও মানুষের ছাদকৃষি প্রচারণারই প্রধান বাহক।
তারাই সম্প্রসারক। আমরা শুধু তাদের উজ্জীবিত রাখি। উৎসাহের দরজায় কড়া নাড়ি। বাংলাদেশের দিগন্ত পেরিয়ে এই নাগরিক কৃষক এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। পৃথিবীর দেশে দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে ঢেউ উঠছে প্রবাসে বাঙালির আঙিনা কৃষির। গড়ে উছেছে নাগরিক কৃষির এক মহাস্রোত। হৃদয়ে মাটি ও মানুষ ২০০৪ থেকে ২০২২ সাল, একটি সক্রিয় অভিযানের গল্প। যে গল্পের সঙ্গে আমি আমার জীবনের সিংহভাগজুড়ে রোপণ করেছি এই বাংলার কৃষিজীবীর ভালো থাকার শুভকামনা। কৃষিকে দেশের সব কিছুর ওপরে রাখার বাসনা। পৃথিবীর দেশে দেশে আজকের কৃষির সব আধুনিক উৎকর্ষ ও প্রযুক্তির ভিতর দিয়ে আজকের দিনের যোগসূত্র গড়তে গিয়ে স্বপ্ন দেখি, কৃষিই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, কৃষিই আমাদের টিকিয়ে রাখবে। পৃথিবীর সব কৃষকের প্রতি ভালোবাসা।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব