বাবা, দেখতে দেখতে তিন বছর। যেখানে তোমাকে ছাড়া একটি দিন কল্পনা করতে পারতাম না, সেখানে তোমার স্মৃতি নিয়েই তিনটি বছর কেটে গেল। তুমি বলতে জীবন বড় কঠিন, বিগত বছরগুলোতে সেটা হরহামেশাই টের পেয়েছি। কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষকে রং বদলাতেও দেখেছি।
তোমার মৃত্যুর পর আমার আর চন্দ্রসমিতার স্বাভাবিক হতেই দুই বছর লেগেছে। এটা আমি মানতেই পারি না। সবকিছুতেই তোমার স্মৃতি। বুক ফেটে কান্না আসে যখন বলতে হয় ‘আমার বাবা নাই’। সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম, তোমার কবরে গেলে মনে হয় আল্লাহ কেমন রেখেছেন তোমাকে? বাড়ির দালানটার দিকে তাকালেই মনে হয়, তুমি বসে একটা সিগারেট ধরাবা। আশরাফ শাহীন চাচুকে ডেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় আড্ডা দিতে। আজ শাহীন চাচুও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি কীভাবে একজন বটবৃক্ষের শূন্যতা শুধু সন্তানদের না পুরো পরিবারকেই এতিম করে দেয়। বাংলাদেশের মজলুম ও গরিব মানুষের দুঃখ বুঝতে দেখেই হয়তো আল্লাহ তোমাকে এত সম্মান দিয়েছিলেন। বিভিন্ন দল, মত, আদর্শ, পেশার মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক রেখেছিলে। একসময় আমাদের উত্তরার বাসায় রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সবাই তোমার ডাকে আসতেন। সারা দিন খাওয়াদাওয়া আর আড্ডা হতো বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের। বারবার মানুষের পক্ষেই লিখেছিলে। এক-এগারোতে একটি সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে একাডেমিক ডিবেট করেছিলে। আর এই ‘অপরাধে’ পরবর্তী সময়ে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। এক-এগারোর পর দুই বছর কোথাও চাকরি করতে পারনি। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। ছয়-সাত মাসের ব্যবধানে দুটো হার্ট অ্যাটাক। সেই দিনগুলোর গল্প আল্লাহ আর আমরা জানি।
তোমার মৃত্যুর আগে কারও কারও ক্ষোভ ছিল তুমি কেন আগের মতো আর লিখ না। কেন আরও প্রতিবাদী হওনি। তুমি কষ্ট পেতে। একবার গোলাম মাওলা রনি আঙ্কেলকে নাকি বলেছিলা ‘আগে সাংবাদিকতা করতাম এখন চাকরি করি।’ দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন না থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও থাকে না। কিছু বললেই নানামুখী চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। আমরাই ভয়ে বলতাম, তোমার দরকার নেই কিছু বলার। ২০১৮ সাল থেকে টক শোতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলে। বলতে ‘মানুষ যা শুনতে চায় সেটা না বলতে পারলে যাব না।’ একবার তো ব্যাংক লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখা ও রিপোর্ট নিয়ে তোমার আর নঈম নিজাম আঙ্কেলের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছিল। আজ তোমার অনেক কাছের মানুষই ভালো নেই। তোমার শূন্যতা তোমার কাছের মানুষকে এখনো কাঁদায়। বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠান সঙ্গে ছিল বলেই আমরা সচ্ছল জীবন পেয়েছি, বিদেশে পড়েছি। তোমার মৃত্যুর পরও বসুন্ধরা গ্রুপ আমাদের পাশে থেকেছে। আল্লাহ বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তাঁর পরিবারকে ভালো রাখুক এই দোয়া করি। তোমার জীবনটাই ছিল যুদ্ধের। শেষ দিন পর্যন্ত সত্যিকারের কার্যকর সংসদের মাধ্যমে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলে। বারবার বলেছ গণতন্ত্র ‘দুই চাকার বাইসাইকেল।’ করোনার সময় গার্মেন্টশ্রমিকদের চাকরির নিশ্চয়তা চেয়ে কড়া ভাষায় গার্মেন্টমালিকদের সমালোচনাও করেছ। স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিতে সাহস লাগে আবার চড়ামূল্য দিতে হয়। কোনো দিন কোনো সরকার থেকে সুযোগসুবিধা বা প্লট নাওনি। তুমি একবার লিখেছিলে ‘জনগণ দ্রোহ করলে ভেসে যায় সব।’ সেটাই হয়েছে ২০২৪ সালে, জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছিল। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। আমি জুলাই আন্দোলনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার পক্ষে ছিলাম। নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি। তুমি তো কোনো দিন আমাদের একাডেমিক রেজাল্ট নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলে না। শুধু বলতে মানবিক মানুষ হতে। আবেগ-অনুভূতি ছাড়া মানুষ হয় না। সারা জীবন নির্যাতিতের পক্ষেই থাকব কারণ মজলুমের কান্না আমাকে কাঁদায়। কেউ সাহায্যের জন্য এলে সব সময় চেষ্টা করেছি খালি হাতে না ফেরাতে। আল্লাহ আমার বাবাকে ভালো রাখুক।