এই জীবন তো অল্প দিনের জন্য। দুনিয়ার জীবন তো খুবই সামান্য সময়। আর দুনিয়ার আয়ু খুব অল্পই বাকি আছে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের আয়ু তো দুনিয়ার আয়ুর চেয়ে অনেক কম। আল্লাহই ভালো জানেন আমাদের কার কখন মৃত্যুর ডাক চলে আসবে। আল্লাহর কসম! আমরা এটাও জানি না, যে যে অবস্থায় আছি সেখান থেকে নড়াচড়া করতে পারব কিনা? তা হলে পাপ কাজ করে কী লাভ। পাপের ফলে দুনিয়াতেও নানা বালামুসিবত নেমে আসে আবার আখেরাতেও রয়েছে চরম শাস্তি। সুতরাং আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমাদের উচিত, বাকি জীবনটাকে আল্লাহকে ভয় করে চলা, ফরজ কার্যাবলি যথাসময়ে পালন করাসহ আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা; আল্লাহর আনুগত্য করে চলা। কারণ শেষ ভালো যার সব ভালো তার। দয়াময় আল্লাহ বান্দার শেষ আমলটা গ্রহণ করবেন। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকের আল্লাহর দিকে ফিরে আসা উচিত। এই জীবনের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়া আবশ্যক। নিজেদের নফসের ব্যাপারে প্রত্যেকে সতর্ক হই। এই জীবন আমাদের জন্য আমানতস্বরূপ এবং কাল কিয়ামতের মাঠে আমাদের বদ আমলের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে। এই শাস্তির ব্যাপারে কোরআনুল কারিমের অনেক আয়াত দ্বারা আল্লাহপাক অসংখ্যবার সতর্ক করেছেন। আল্লাহর কসম! আমাদের কেউ যদি তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য কাটিয়ে দেয় তবু সে আল্লাহর হক আদায় করতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ আমাদের অল্প ইবাদতেই সন্তুষ্ট হয়ে যান। আমাদের কেউ যদি আল্লাহর নাফরমানি করে দুনিয়ায় কাটাতে চায় ... কবরের এক সেকেন্ডের আজাব দুনিয়ার সব নেয়ামতকে ভুলিয়ে দেবে। আল্লাহর কসম! জাহান্নামের মাঝে যদি একবার ডুবানো হয় ওই একবারই দুনিয়ার সব নেয়ামতের কথা ভুলিয়ে দেবে। তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করাটা কতই না ভয়াবহ বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য রসুল (সা.) বলেন, তুমি দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন আগন্তুক অথবা পথচারী মুসাফির (সহিহ বুখারি)। আর তুমি নিজেকে কবরবাসী মনে কর। তাই দুনিয়ায় আমাদের প্রত্যেককেই কবরবাসী মনে করা উচিত। আল্লাহর কসম! কবরবাসীরা দুনিয়ায় ফিরে যেতে চাইবে শুধু একবার আল্লাহর জিকির করার জন্য এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করার জন্য। ওই রূপ বাক্য যাতে বলা না লাগে, তজ্জন্য আমরা প্রত্যেকে নিজকে কবরবাসী ভাবতে শিখি আর এটি রসুল (সা.)-এর উপদেশ। এ জন্য ইবনে ওমর (রা.) আনহু বলতেন, কেউ সকালে উপনীত হলে সে যেন সন্ধ্যার অপেক্ষা না করে আর সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের অপেক্ষা না করে। আর আমরা সুস্থ থাকা অবস্থায় যেন অসুস্থতার প্রস্তুতি এবং জীবিত থাকতেই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিই। এ জন্য মৃত্যুর পূর্বেই জীবনকে কাজে লাগাই কেননা আমার জানি না আগামীকাল আমাদের কী নামে ডাকা হবে। তাই আমরা তো এখনো জীবিত ও সুস্থ আছি আর আমাদের সামর্থ্য ও অলস সময়ও রয়েছে। আমরা কি পারি না আল্লাহর জিকির করতে? চাকরিজীবীরা কর্মস্থলে যাওয়ার প্রাক্কালে গাড়িতে, ট্রেনে বাসে যে যেভাবেই যাচ্ছি, রিকশাচালক বাসচালক যাত্রীর অপেক্ষায় যে অলস সময় কাটায়, কৃষক-শ্রমিক দিনমজুর তাদের কাজের সময় এমনকি মা-বোনেরা গৃহস্থালি কাজের সময় স্ব-স্ব অবস্থানে বসে ওই অলস সময়ে বলতে পারি- ১. আস্তাগফিরুল্লাহ- (১০০ বার) সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লাইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবার। আল্লাহ সুবহানুতায়ালার কাছে এই চারটি বাক্য অতি প্রিয় (মুসলিম)। ২. রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিবসে একশতবার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি পাঠ করবে তার পাপ মুছে ফেলা হবে যদিও উহা সাগরের ফেনা রাশির সমান হয়েছে (বুখারি ও মুসলিম)।
৩. লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ এই বাক্যটি হলো বেহেশতের রত্নভান্ডার (বুখারি ও মুসলিম)। ৪. নবী (সা.)-এর দরুদ ও সালাম পাঠসহ আমাদের জানা অন্যান্য তাসবিহগুলো উপরিউক্ত তাসবিহগুলো আমরা আমাদের যাত্রাপথে চলতেফিরতে সব পর্যায়ের পেশার আল্লাহর বান্দারা পাঠ করে অলস সময় কাটাতে পারি। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যে যেখানে যে অবস্থায় থাকি না কেন, সময় বের করে পবিত্র হয়ে আদায় করে নেব। কোনো অজুহাত এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ সালাত আদায়ে বাধা সৃষ্টি করার কোনো ক্ষমতা কারও নাই যদি নিজে নিজকে বাধ্য না করি। হৃদয়ের ইমানি দৃঢ়তাই আমাদের ফরজ সালাত আদায়ের জন্য যথেষ্ট। আমাদের কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্য করতে গিয়ে খুব কষ্টেও দিনাতিপাত করে তবে তার দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটা হবে আনন্দের মুহূর্ত আর তখন সে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করতে থাকবে এবং আল্লাহতায়ালাও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করবেন। তখন তার এই আনন্দ পৃথিবীর জীবনের সব কষ্ট দূর করে দেবে। আল্লাহর একজন আনুগত্যশীল বান্দা যখন তার মৃত্যুর সময় এসে যাবে আর ফেরেশতাগণ উপস্থিত হবে এবং মৃত্যুর ফেরেশতা তার মাথার কাছে এসে দাঁড়াবে, তখন তাকে ডেকে বলবে, হে প্রশান্ত আত্মা! যে কিনা একটি দেহের মাঝে ছিল, তুমি বের হয়ে এসো এবং শান্তি ও সুখের সুসংবাদ গ্রহণ করো (ফাজর-২৭-২৮)। তাই আসুন আমরা সময় থাকতে ওই আহ্বান শোনার প্রস্তুতি গ্রহণ করি। হে আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের পথ দেখাও। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক