১. রাজাদের যুগ শেষ। এখন প্রজাদের যুগ। প্রজারাই রাজা, তারা দেশের মালিক। সম্প্রতি সংবিধান সংস্কার কমিটি সুপারিশ করেছে সংবিধানের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ বাংলাদেশের পরিবর্তে ‘জনগণতন্ত্রী’ হবে। বাংলা অভিধান অনুযায়ী তন্ত্র শব্দের অর্থ রাষ্ট্রশাসিত পদ্ধতি যেমন প্রজাতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক প্লেটোর রিপাবলিক অর্থ প্রজাতন্ত্র, সদস্যদের সমান সুযোগসুবিধা আছে। যাঁরা সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং বাংলা-ইংরেজি যথাযোগ্য শব্দ বা বাক্যচয়ন করেছিলেন তাঁরা চিন্তাভাবনা, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের নামকরণ করেছিলেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। গণপ্রজাতন্ত্রী সংবিধান অর্থ হলো সর্বস্তরের জনগণের জন্য সংবিধান। সে কারণে বিগত ৫৩ বছর ধরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান চালু রয়েছে। অফিস-আদালত, কোর্ট-কাচারি, আইনকানুন, বিধিবিধান অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে এই সংবিধান যথার্থভাবেই কার্যকর আছে। সে কারণে হঠাৎ করে নাম পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
২. প্রস্তাবনায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ কথা ঐতিহাসিক ও আদর্শিকভাবে সত্য, ‘বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করে। প্রস্তাবনায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’র পরিবর্তে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এটা ঠিক বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ছিল সশস্ত্র, সে জন্য সশস্ত্রভাবেই তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সশস্ত্রযুদ্ধে যাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন মার্চ মাস ’৭১ সাল থেকে তাঁদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সরকারিভাবে অভিহিত করা হয়েছে। জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা, মুক্তিবাহিনী সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে আত্মবলিদান ও আত্মোৎসর্গ করেছেন। ইতিহাসে তাঁরা অমরত্ব লাভ করেছেন। আমরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম তাঁদের ফ্রিডম ফাইটার এফ.এফ হিসেবে সরকারিভাবে আখ্যায়িত করা হতো।
যুদ্ধের শেষ দিকে ‘মুক্তি আ গিয়া’ শুনলেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হৃৎকম্পন শুরু হতো। এটি বাস্তব সত্য। মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১৫ মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা বীরত্ব দেখিয়েছেন তাঁরা চার স্তরে গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড পাবেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ডের নাম পরিবর্তন করে ১নং স্তরকে বীরশ্রেষ্ঠ, ২নং স্তরকে বীরউত্তম, ৩নং স্তরকে বীরবিক্রম এবং ৪নং স্তরকে বীরপ্রতীক নামকরণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সর্বমোট ৪৩ জনকে উপাধি প্রদানের জন্য বাছাই করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ প্রতিরক্ষা দপ্তরের আন্তঃসার্ভিস প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৭ জনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বীরউত্তম, ১৫৯ জনকে বীর বিক্রম ও ৩১২ জনকে বীরপ্রতীক অর্থাৎ ৫৪৬ ব্যক্তিকে বীরত্বসূচক খেতাব প্রদান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মেজর জিয়াউর রহমানকে বীরউত্তম তালিকার শীর্ষে স্থান দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করে দেশের কাজে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ কমান্ড কাউন্সিল গঠন করেন এবং নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদান করেন। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ শব্দ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অর্থহীন হয়ে পড়ে।
৩. প্রস্তাবনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সংবিধানের মূল উৎসের অনুসন্ধান। জনগণের কর্তৃত্ব এবং অনুমোদনের ফলে সংবিধান চূড়ান্ত রূপ গ্রহণ করেছে, বাংলাদেশের সংবিধানে তার উল্লেখ আছে। প্রস্তাবনার শুরুতেই ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’। শব্দসমূহ সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে : সংবিধানের উৎস এবং অনুমোদন। ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’-এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রণেতাগণ জনগণকেই সংবিধানের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তাদের সার্বভৌম ইচ্ছাই সংবিধানের ভিত্তি। তাদের ইচ্ছানুযায়ীই সংবিধান প্রণীত ও গৃহীত হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের প্রস্তাবনাতেও ‘আমরা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ’ শব্দসমূহ সংযোজন করা হয়েছে। ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’-এর মধ্যে বাংলাদেশের জনসাধারণের সার্বভৌম ক্ষমতার তত্ত্ব মালিকানা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৪. ১৯৭২ সালের প্রণীত সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সম্প্রতি সংস্কার কমিশন জাতীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাদ দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের উৎস সন্ধানে নিশ্চিতভাবেই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা ছিল আমাদের প্রেরণার অন্যতম শক্তি। যার উৎস ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বা রিলিজিয়াস স্টেট হতে আমরা নেশনস স্টেট বা জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহাসিকভাবে সংগ্রাম করেছি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ কথা নিতান্তই পরিষ্কার যে জাতীয়তাবাদ সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ তা কেউ অস্বীকার করেননি। প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ গঠন করেন। জাতীয়তাবাদ না থাকলে দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্বে আঘাত করে। বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা অর্ধডজন। গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মধ্যেই বহুত্ববাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে বহু ধর্ম ও মত বিদ্যমান।
এ ক্ষেত্রে ‘রাষ্ট্র সবার ধর্ম যার যার’ এই মৌলিক নীতি বাতিল করলে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্র সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও সংহতির জন্য সব ধর্মমতের সংশ্লেষ হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। শোষণহীন সমাজে এই মৌলিক স্তম্ভ না থাকলে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন সম্ভব নয়। এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল ভিত্তি হলো শোষণহীন সমাজ। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, সমাজে, গ্রামে-শহরে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকবে না। এটাই হলো আগস্ট আন্দোলনের মূল স্পিরিট।
লেখক : ’৭২ সালের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী, লেখক ও গবেষক