আকাশে গনগনে সূর্য। মনে হচ্ছে বুড়ির কুঁড়েঘরের ওপর এসে সূর্য সব তাপ ও আলো ফেলছিল। সূর্যের তাপদাহ থেকে বাঁচার জন্য বুড়ি খাটের দিক পরিবর্তন করলেন। কিন্তু এতে কোনো কাজ হলো না। তারপর তিনি যখন ঝিমাতে শুরু করলেন, ছাদের ওপর ধুমধাম আওয়াজ আর থেকে থেকে অট্টহাসির রোল শোনা গেল।
‘খোদা তার বিনাশ করুক!’ শাশুড়ি তার ছেলে বউকে গজব দিলেন, যে কাবাডি খেলছিল এবং মহল্লার ছোকরাদের সঙ্গে মজা করছিল। শাশুড়ি-মা ভেবে বিস্মিত হলেন এই ভেবে যে, এরকম একটা ছেলের বউ থাকতে কে বাঁচতে চায়! বাইরে তপ্ত রোদ আর সে ছাদের ওপর। দলবেঁধে ছেলেমেয়েরা আসে। কেউ এক পলক ঘুমাতে পারে না।
‘বউ... উ...উ’ গলায় আটকানো শ্লেষ্মার পাহাড় ঠেলে বুড়ি চিৎকার করে ডাকলেন। বিরক্তিতে চেঁচামেচি ও গজগজ করতে করতে সে জবাবে বলল, ‘এখনই আসছি’। এমনভাবে সে লাফালাফি করছিল যেন তার মাথায় ভূতের নাচ চলছিল।
‘আরে এখনই আয়। নইলে কিন্তু...’ বউ ছাদ থেকে নেমে এলো নূপুরের রুনুঝুনু শব্দ সহযোগে। তার পেছন পেছন নেমে এলো একদল নগ্ন, অর্ধনগ্ন ও কুষ্ঠের মতো পায়ে ফুটফুটে দাগওয়ালা ছোকরা। এদের মধ্যে কেউ কেউ ফ্যাত-ফ্যাত নাক টানছিল। পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে তারা বুড়ির দিকে কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল।
‘ওহ খোদা, এই জারজের দলকে নিয়ে যা, আর না হয়, আমার জন্য আজরাইল পাঠিয়ে দে। এই ছোকরাগুলো এখানে এসে কেন আমাকে জ্বালিয়ে মারছে, জানি না। শেয়াল-কুকুরের মতো বাচ্চা পয়দা করে ছেড়ে দিল মা-বাপেরা, আর এখন আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে তুলল এরা।’ এরকম আরও কত গালি। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো একে অন্যের দিকে ঘুষি তাক করে দাঁত বের করে হাসছিল।
‘তোদের ঘরে আগুন লাগুক...’
‘বাশাইরয্যা তুই কেন মরে গেছিলি’ এই বলে বউ তার পাশে দাঁড়ানো একটা মেয়েকে কনুইয় দিকে খোঁচা দিল।
এটা যে তার দিকে ইঙ্গিত ক’রে করা হয়েছিল সেটা বুঝতে পেরে বুড়ি চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘তোর মুখে ঝাটা মারি। তোর চৌদ্দগুষ্টি নিপাত যাক... তোর...’
‘বাহ্ রে, আমরা আপনার সম্পর্কে কথা বলছি না...’ বউ আদরের সুরে বলল। কিন্তু বুড়ি রাগে ফুলতে লাগলেন। ছেলেমেয়েগুলোকে তিনি এমন তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করলেন, তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বউ খাটে বসে পড়ল।
‘কারও ঘরের বউ কি তোমার মতো ছেলেদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়?’ রাত নেই, দিন নেই খালি ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা ... ‘মনে হলো শাশুড়ি জীবনের প্রতি বিরক্ত।’
‘ঘুন... ঘুন... ঘুন..., হাতপাখা থেকে খড় ছড়িয়ে সেগুলো তোতাপাখির খোঁয়াড়ে ছুড়তে ছুড়তে বউ আওড়ালো। ‘টি... টি..., ’ তোতাপাখিটি ব’লে উঠল।
‘শুধু শুধু পাখিটাকে ঘাটাচ্ছিস কেন?’ শাশুড়ি গজ গজ করে উঠলেন।
‘এটা কথা বলে না কেন?’
‘তাতে তোর কী? এটা তার মর্জি। তোর বাবা খাওয়ায় এটাকে?’ শাশুড়ি মুখ ফিরিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘আমি এটাকে কথা বলিয়ে ছাড়ব।’ বউ আরেকটা খড় ছুড়ে দিল তোতা পাখিটার গায়ে।
‘এই, এই ... তোর মাথা খারাপ নাকি? তুই এখান থেকে যাবি, নাকি আমি দুয়েক ঘা লাগাব...’
শাশুড়িকে অগ্রাহ্য করে বউ তোতাপাখিটাকে ত্যক্ত ক’রে চললে তিনি রেগে গিয়ে তাঁর বাঁকানো একটা জুতো ছুড়ে মারলেন বউয়ের দিকে, জুতোটা গিয়ে খাজাঞ্চির নিচে শুয়ে থাকা কুকুরের গায়ে পড়লে সেটা ঘেউ ঘেউ ক’রে উঠল। বউ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। শাশুড়ি অন্য জুতাটা কুড়িয়ে হাতে নিলে বউ পিলারের অন্য পাশে নিজেকে আড়াল করে নিল।
‘আসগর ছেলেটা আসুক আজকে...।’
‘ছেলে!’ স্বামীর নাম নিতে শুনে বিব্রত হওয়া তো দূরের কথা, বউ আরও জোরে জোরে হাসতে লাগল।
‘গজব পড়ুক তোর ওপর! একটা বাচ্চা পর্যন্ত জন্ম দিতে পারলি না তুই। এ ঘরে তুই আসার দিন থেকেই অনিষ্ট শুরু!’
বউ হেসে পাখির খাঁচাটাতে আরেকটু নাড়া দিল।
‘তুই তোতা পাখিটার পেছনে লেগেছিস কেন?’
‘পাখিটাকে আমি কথা বলিয়ে ছাড়ব।’
‘বুড়ি রাগে ফুঁসতে লাগলেন। তুই এরকম করতে থাকবি তো আমি আমার ছেলেকে আবার বিয়ে করাব।’
সূর্য সরে গিয়ে শতরঞ্জির ওপর পড়ল।
শাশুড়ি বিড়বিড় করতে লাগলেন- মেয়ের সঙ্গে তারা যৌতুক হিসেবে কী এমন দিয়েছে?... এই, কি আজিব উপহার! নকল মাদুলি ও ক্রোমিয়াম প্লেটে তৈরি কিছু গয়না ছাড়া। আর... ‘তো, আমি কী করব এজন্য?’ এ ধরনের বিরক্তির ঝামটাঝামটিতে বিরক্ত হয়ে বউ হাত-পা ছড়িয়ে খাটের ওপর শুয়ে পড়ল।
‘এবং ওই এ্যালুমিনিয়ামগুলো...’
হাই তুলতে তুলতে বুড়ি একনাগাড়ে ব’লে যাচ্ছিলেন। তারপর তিনি ঝুড়ির ওপর মাথা রেখে পা দুটো ছড়িয়ে দিলেন। যা হোক, ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়া পর্যন্ত বুড়ি এ কথা সে কথা বলে বউকে খোটা দিতে লাগলেন।
বুড়ির সেই গজরগজরের বেশির ভাগই ছিল যৌতুক নিয়ে তার অস্বস্তির প্রকাশ। কিন্তু বেশরম বউটা খাটের ওপর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। শিগগিরই বুড়ির বিড়বিড়ানি নাক ডাকায় রূপ নিল।
আসগর ঘরে ঢুকল, পিলারের সঙ্গে তার ছাতাটা রাখল, ওয়েস্টকোট ছেড়ে শার্ট দিয়ে শরীরের ঘাম মুছে নিল। দুষ্টু ছেলের মতো সে প্রথমে মায়ের দিকে এবং পরে বউয়ের দিকে গোপনে চেয়ে নিল। বস্তাভর্তি আম ও তরমুজ মেঝেতে রেখে কিছুক্ষণ ধরে মাথা চুলকাতে লাগল সে। তারপর নিচু হয়ে বউকে বাহু ধরে নাড়া দিল।
‘উফ’, বউ বিরক্ত হয়ে বাহু ছাড়িয়ে নিল। তারপর পাশ ফিরে অতল ঘুমে হারিয়ে গেল।
আসগর বস্তাটা উপরে তুলল এবং কিছুক্ষণ ইতস্তত নাড়াচাড়ার পর ভেতরের রুমে চলে গেল। চালাকচতুর বিড়ালের মতো গলা বাড়িয়ে বুড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বউ গলায় ওড়না চড়িয়ে ত্বরিত ভেতরের রুমে দৌড়ে গেল।
পায়খানা বন্ধ হয়েছিল। ঘাম ঝরে চলছে।...
আমের ঘ্রাণে ময়লার টাল থেকে মাছি এসে ভনভন করতে লাগল ঘরের ভেতরটাতে। বুড়ির গায়ের ওপর মাছি গিজগিজ করছিল। কিছু কিছু মাছি বুড়ির ঠোঁটে জমা পানের রসের স্বাদ নিচ্ছিল আর কতগুলো বুড়ির গভীর চোখের কোটরে গিয়ে বসেছিল... ভেতরের রুম থেকে গোঙানির মতো করে কান্নার শব্দ ভেসে আসল। আম আর তরমুজ ছিলানোর শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
মাছিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ বুড়ির ঘুম ভেঙে গেল। মাছি মানুষের চিরন্তন সঙ্গী। সদ্যোজাত বাচ্চার গায়ে বসে ঘ্রাণ নিয়ে এদের যাত্রা শুরু, তারপর সারা জীবন আর পিছু ছাড়ে না মানুষের। ঘুমে হোক, জাগ্রত অবস্থায় হোক, শরীরের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো এরা সারা জীবন পিছু ছাড়ে না। একটা বিশেষ মাছি তো তাকে আজীবন জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছিল। তিনি যখন লক্ষেèৗতে থাকতেন, তখন এটা প্রথম কামড়েছিল।...
তারপর তিনি উন্নাওতে গেলেন। এটা তাকে আবারও কামড়েছিল সেখানে বর্ষাকালে। উন্নাও থেকে তিনি সন্ধিলা গিয়েছিলেন। সেখানেও এটা তার পিছু নিয়েছিল। এটা যদি তার শরীরের বিশেষ কোনো অঙ্গের সঙ্গে মিশে থাকত, এতদিনে তিনি সেই অংশটা কেটে কোনো একটা মাছির মুখে তুলে দিতেন। কিন্তু এটা তাঁর সারা গায়ে গিজগিজ করে। মাঝেমধ্যে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেন মাছিটাকে। সেই একই ডানা, শূল, কোঁকড়ানো পা ও কন্দযুক্ত মাথা। অনেকবার তিনি এটাকে মারতে লক্ষ্য স্থির করেন, কিন্তু ঠিক মুহূর্তে এটা গোত্তা খেয়ে সরে যায়। তিনি খোদার কাছে প্রার্থনাও করেছিলেন এটার মৃত্যুর জন্য। মারতে না পারলেও অন্তত পঙ্গু, খোঁড়া বা একটা ডানা হলেও যদি ভেঙে দিতে পারতেন, তখন মজা দেখতে পারতেন এটা কীভাবে ব্যথায় কাতরায়। কিন্তু তার এই ইচ্ছে কখনো পূরণ হয়নি। হয়তো ঈশ্বর এটার কাছে হার মেনেছেন যেমন তিনি হার মেনেছিলেন শয়তানের কাছে, এবং পরবর্তীতে সেই শয়তান মানবজাতিকে বিপথগামী করে চলছে প্রতিনিয়ত। তিনি ঈশ্বরের কাছে বারবার এই মাছিটার দেহাবসানের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ...মাছিরাও কি স্বর্গে যাবে এবং সেখানকার পরিবেশ নষ্ট করবে? বুড়ি হাতপাখা দিয়ে হাত, পা ও মুখের চারদিকে বাড়ি দিলেন মাছিটাকে মারার উদ্দেশ্যে।
‘বউ... ও বউ... দুনিয়ার কোন প্রান্তে তুই?’ বুড়ি ডাক দিলেন। ভেতরের রুম থেকে বউ তড়িঘড়ি ক’রে বেরিয়ে এলো। তার বুকে ওড়না নেই এবং কোর্তার উপরের অংশটা খোলা। হাতে আমের একটা আঁটি ধরা ছিল, দেখে মনে হলো কিছুক্ষণ আগে কারও সঙ্গে হাতাহাতি করছিল। বউ তারপর তড়িতাহতের মতো ফিরে গিয়ে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়াল এবং খাটের পেছনে হাত মুছে ফিরে এলো।
‘আরে বউ... আমি বলছিলাম... আমার তৃষ্ণা পেয়েছিল।’
আসগরও বেরিয়ে এলো শার্ট দিয়ে গলা মুছতে মুছতে।
‘আম্মা তুমি এখানে। এই দেখ কতগুলো রসালো আম এনেছি!’ সে এটা বলে আমের বস্তাটা কোলের ওপর তুলে নিল এবং তারপর খাটে বসে পড়ল।
তরমুজ ও আমের ঘ্রাণ পেয়ে বুড়ি তার ওপর মাছির শত অত্যাচারের কথা ভুলে গেলেন। আম দেখে তার ঠোঁট থেকে লালা ঝরার মতো অবস্থা।
‘এই বউ, একটা ছুরি আনতো।’
বউ বাটি হাতে নিয়ে আমের আঁটি চুষে খাচ্ছিল। আসগর পা টেনে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে বউয়ের গোড়ালিতে চাপ দিল। বউয়ের হাত থেকে পানি বুড়ির পায়ে পড়তেই তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘তুই কি আঁন্ধা হয়ে গেছিস, হাত থেকে পানি ফেলে আমাকে ভিজিয়ে দিবি?’ এই বলে তিনি এত জোরে ধাক্কা মারলেন, হাত থেকে ভারী পানির পাত্রটি বউয়ের পায়ের ওপর ধুম ক’রে পড়ল। বউ দাঁতে দাঁত চেপে আসগরের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই চলে গেল।
‘আম্মা, এই তো পানি’, বাধ্য বালকের মতো আসগর বলল।
‘বউ রেগে গেছে।’
‘তুই নিজের চিন্তা কর,’ বলে বুড়ি অভিযোগ করলেন।
‘কুত্তিটাকে ঝেটিয়ে বিদেয় কর। আম্মি, আরেকটা মেয়ে নিয়ে আসি চলো। এটা...’ আসগর এটা বলে বউয়ের দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
‘চুপ কর, বজ্জাত!’ বুড়ি খেঁকিয়ে উঠলেন।
‘কেন আম্মি? দেখ সে কীভাবে মোষের মতো মোটা হচ্ছে।’
এটা বলে মায়ের নজর এড়িয়ে আসগর বউয়ের কোমরে আঙুলের টোকা দিল। বউ আসগরের গায়ে ছুরি ছুড়ে মারল; কিন্তু এটা বুড়ির সামনে দিয়ে বস্তার ওপর গিয়ে পড়ল।
‘আম্মা দেখলে?... আমি একে একটা ধোলাই দেব? আসগর উঠে বউয়ের পিঠে এক ঘা লাগিয়ে আবারও খাটে এসে বসল। মায়ের বাধ্য সন্তান সে।
‘খবরদার!... শোন, তুই যদি আরেকবার ওর গায়ে হাত তুলতে যাস, আমি তোর হাত জোড়া গুঁড়ো করে দেব’, বুড়ি তাঁর শত্রুর পক্ষে কথা বললেন। ‘তোর একটা ঠিকঠাকমতো বিয়ে হয়েছিল। সে কি তোর সঙ্গে পালিয়ে এসেছে যে, তুই ওর সঙ্গে এরকম আচরণ করবি?... এই মেয়ে, অল্প জল নিয়ে আয় তো, তাড়াতাড়ি আয়,’ বুড়ি বউকে আদেশের সুরে বললেন।
বউ পিলারের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাগে ফুঁসছিল। বুড়ি যখন আমের খোসা ছড়াচ্ছিলেন সে তার থেঁতলে যাওয়া বুড়ো আঙুলটার ওপর পানির পাত্রটা দিয়ে জোরে চাপ দিলে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। তারপর বউ যখন শাশুড়িকে চিনির বয়াম দিতে গেল, তিনি তার আঙুলে রক্তের দাগ দেখলেন
‘আহা রে মা! রক্ত কেমনে আসল?’ কিন্তু বউ জবাব না দিয়ে, পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে লাগল। অন্যদিকে আঙুল বেয়ে রক্ত পড়ছিল।
‘এই, এদিকে আয়। দেখি দেখি কী হয়েছে?’ বুড়ি নরম সুরে বললেন।
বউ তার অবস্থান থেকে নড়ল না।
‘দেখ তো কীভাবে রক্ত ঝরছে। আসগর ওঠ, এদিকে আয়। ঠান্ডা পানি এনে ওর আঙুলের ওপর ঢাল।’
শাশুড়িরা গিরগিটির মতো।
‘আমি পারব না, ‘নাক টেনে জবাব দিল আসগর।
‘কুত্তার বাচ্চা!’ বুড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে এলেন। ‘আয় মা এদিকে আয়, খাটের ওপর শুয়ে পড়। এই পাত্রটার ওজন প্রায় এক কেজি। পাঁজিটাকে হাজারবার বলেছি, এটা বদলে এ্যালুমিনিয়ামের একটা আনতে। কিন্তু সে একটা কুত্তার বাচ্ছা! আয়, ওঠার চেষ্টা কর।’ বউ এক ইঞ্চিও নড়ল না। সে নাক ফুলিয়ে কেঁদে কেঁদে ওড়না দিয়ে নাক মুছতে লাগল।
‘কলসি থেকে পানি ঢাল,’ বুড়ি রেগে গিয়ে আদেশ করলে আসগর না উঠে পারল না। বুড়ি তাঁর নিষ্প্রভ, কম্পমান হাত দিয়ে রক্তের দাগ ধুয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন যখন দেখলেন আসগর পানি ঢালার পরিবর্তে বউয়ের বুকের দিকে হা ক’রে চেয়ে আছে। তিনি আরও অনুমান করতে পারলেন, বউ আসগরের কানে কামড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল যেহেতু সে খুবই কাছে চলে এসেছিল।
‘তোর শরীর পোকায় খাক!’ বলে বুড়ি আসগরের কাঁধে এক ঘা বসিয়ে দিলেন। রেগে গিয়ে সে বউয়ের গায়ে বালতিটা উপুড় ক’রে দিল। তারপর আম খেতে চলে গেল। মা তৎক্ষণাৎ তার ওপর বড় বড় গজব ডাকা শুরু করে দিলেন।
‘পাঁজি ছেলে, অপেক্ষা কর। তোর মামা আসুক, আমি তোর চামড়া তুলে ছাড়ব। পুরনো কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থানটাতে পট্টি লাগাতে লাগাতে তিনি আসগরকে হুমকি দিলেন।
‘এদিকে আয়, কিছুক্ষণ শুয়ে থাক।’ বুড়ি আঘাতটাকে সাংঘাতিক মনে ক’রে আসগরকে ডেকে বউকে কোলে ক’রে খাটে নিয়ে যেতে বললেন।
‘আমি ওকে তুলতে পারি না। সে মোষের মতো ভারী।’
‘তোকে তুলতেই হবে... এখন, তুই আমার কথা শুনবি, নাকি...’ আসগর নড়ছে না দেখে শাশুড়ি নিজেই বউকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
শাশুড়ির কোলে চড়তে গিয়ে সুড়সুড়ি খেতে হবে এই ভয়ে বউ বলল, ‘আম্মা আমি নিজে উঠতে পারব।’
‘না, মা... আমি...’ তিনি আজগরের দিকে এমনভাবে তাকালেন আজগর ভয় পেয়ে গেল।
কাল বিলম্ব না করে আজগর উঠে এলো এবং তড়িৎ বউকে কোলে তুলে নিয়ে খাটের দিকে দৌড় দিল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বউ আজগরের ঘাড়ে একটা আস্ত কামড় বসিয়ে দিল যেখানে একটু আগে বুড়ি থাবা বসিয়েছিলেন। পর্যুদস্ত আসগর বউকে খাটে ছুড়ে ফেলে তার গোলাপি ঠোঁটে সশব্দ চুম্বন এঁকে দিল।
বউ এবার বিজয়ের হাসি হাসতে লাগল, আর আসগর তার কাঁধের আহত জায়গাটাতে হাত বুলাতে বুলাতে গজগজ ক’রতে লাগল। শাশুড়ি ওজু করছিলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে কি যেন আওড়াচ্ছিলেন। কে জানে উনি কি আওড়াচ্ছিলেন? সম্ভবত তিনি তাঁর বেহায়া বউকে অভিসম্পাত করছিলেন।