দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ছয়টি। ছাত্র-ছাত্রী ছিল মাত্র ৩০ হাজার। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১৭৩টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ। এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় দেখভালের দায়িত্ব ইউজিসির। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কোনো ক্ষমতা নেই বললেই চলে। আইনে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা না থাকা, জনবল সংকট, বিভিন্ন মহলের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে অনিয়ম করা বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারে না ইউজিসি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন ভঙ্গ হলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না ইউজিসি। ইউজিসি শুধু সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠাতে পারে, কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণে অক্ষম এই প্রতিষ্ঠান। ইউজিসির প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে- দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সব থেকে দুর্বল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এ দেশের ইউজিসি।
জানা গেছে- ভারত, পাকিস্তান এমনকি আফগানিস্তানের ইউজিসিরও আইন অমান্যে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এদেশে গত দেড় দশকে উচ্চশিক্ষা কমিশন করতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও তা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এবার ফের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের। জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই কমিশন গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী মাসেই এই প্রক্রিয়া শেষ করার কথা রয়েছে।
তথ্যমতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তদারকির জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন-১৯৭৩। সে সময় দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ছয়টি। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তাধারাই ছিল না তখন। ১৯৯২ সালে দেশে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২ প্রণয়ন করা হলেও ২০১০ সালে ’৯২ সালের আইন রহিত করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এ আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কার্যত কোনো ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি ইউজিসিকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর মাত্র ৩৩ বছরের ব্যবধানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা পৌঁছায় ১১৭টিতে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পরেও ঠুঁটো জগন্নাথই রয়ে গেছে ইউজিসি।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সব থেকে দুর্বল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এদেশের ইউজিসি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারে না এই প্রতিষ্ঠানটি।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী ইউজিসিকে কমিশনে রূপ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম প্রস্তাবনা পাঠান। এরপর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানও ইউজিসিকে কমিশনে রূপ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দিয়েছিলেন। ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। আমরা একটি কার্যকর উচ্চশিক্ষা কমিশন চাই, যেটি অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে গঠিত হবে। কমিশনের একটি সেক্রেটারিয়েট থাকবে, আর এতে মঞ্জুরি কমিশনের সক্ষমতা বাড়বে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক তদারকির জন্য ইউজিসির প্রচলিত কর্মপরিধির বিস্তৃতি ও ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। দেশের উচ্চশিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে উচ্চশিক্ষা কমিশন হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজে উদ্যোগী হয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। শিগগিরই আমরা বৈঠকে বসে এ কমিশনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করব।