ব্যবসায়ী আসাদুর রহমানের সঙ্গে লিপি আক্তারের (৩৫) দাম্পত্য জীবন এক দশকের। তাদের পুত্রের বয়স (৯) আর কন্যার (৬)। লিপি অধিকাংশ সময় ফেসবুকের মেসেঞ্জারের খুদে বার্তা আদানপ্রদানে সময় কাটান। ঘর-সংসারে মন নেই। কিছুদিন আগে তাদের মেয়েটি ভাঙা কাচের টুকরা দিয়ে হাত কেটে ফেলে। ভয় পেয়ে, ব্যথায় শিশুটি অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করলেও লিপি ব্যস্ত ছিল মোবাইল নিয়ে। পরে অফিস থেকে এসে আসাদুর মেয়ের অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি লিপিকে জেরা করেন। লিপির মোবাইল ঘেটে দেখেন যে গত কয়েক মাস ধরে একজনের সঙ্গে প্রেম করছেন। লিপি মাঝেমধ্যেই সে ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেন। সন্তানদের কথা চিন্তা করে আসাদুর কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে লিপিকে সংসার করার আরেকটি সুযোগ দেন। কয়েক মাস ভালো গেলেই সম্প্রতি লিপির আচরণে আবারও পরিবর্তন এসেছে। স্ত্রীর পরকীয়ার এই ঘটনাটি তুলে ধরে এ প্রতিবেদকের কাছে আসাদুর তার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
স্বামী ও স্ত্রী অন্য নারী-পুরুষে আসক্ত। সন্তান রেখেই একজন, আরেকজনকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কখনো কখনো একজন, অন্যজনকে হত্যা পর্যন্ত করছেন। বিবাহবহির্ভূত বা পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে এখনো প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা চারপাশে ঘটতে দেখা যাচ্ছে। পরকীয়ায় পুড়ছে একের পর এক সংসার, তছনছ হয়ে যাচ্ছে এসব পরিবারের শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হচ্ছে পরকীয়া। এজন্য সারা দেশে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। পরকীয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে চট্টগ্রামে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর রাজধানী ঢাকায় পরকীয়ার কারণে ২৫ শতাংশের বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে। বিবিএস-এর বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩ এর জরিপ থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
পরকীয়ার বেশ কিছু কেস স্টাডি থেকে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে কয়েক মাসের সংসার আবার কিছু ক্ষেত্রে এক দশকের দাম্পত্য জীবন পার করে, সন্তানদের কথা চিন্তা না করে মানুষ পরকীয়া আসক্ত হয়ে সংসার ভেঙে ফেলছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে করুণ পরিণতি হচ্ছে ভুক্তভোগী দম্পতির সন্তানদের। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, বিশ্বায়ন, মিডিয়া কমিউনিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়াচ্ছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এখন গ্রাম-শহর সব জায়গাতেই মানুষ পরকীয়ায় জড়াচ্ছেন। আবার স্বামী কাজের জন্য বিদেশে গেলে এবং কর্মস্থল আরেক জেলায় হওয়ায় স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে না থাকলেও একাকিত্ব থেকে অনেকে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়াচ্ছেন। কোনো কোনো দম্পতি মতের মিল না হওয়া, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকা, পারিবারিক চাপ এবং সঙ্গীকে অবহেলা করাসহ বিভিন্ন কারণে অনৈতিক এই সম্পর্ক তৈরি করছেন। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে পরকীয়ার কারণে হত্যাকান্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় পরকীয়ার সন্দেহে আবু নাইম নামের এক ব্যক্তি তার ১৬ মাসের পুত্র আবদুল্লাহকে গলা টিপে হত্যা করেন। এ ঘটনায় নাইমকে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। জানা গেছে, আবদুল্লাহর জন্মের পর আবু নাইম তার স্ত্রীর ওপর পরকীয়ার তকমা দিয়ে নিজের সন্তানকে অস্বীকার করেন। এ নিয়ে তাদের পারিবারিক কলহ চলছিল। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পথে গলা টিপে হত্যা করেন নাইম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, আমাদের সামাজিকীকরণ ঠিকভাবে হচ্ছে না। সমাজে নৈতিকতা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার এক ধরনের ঘাটতি আছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে যে পরিমাণ সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি থাকা দরকার তারও ঘাটতি আছে। পরকীয়ার কারণে একটি পরিবার ভেঙে গেলে তার প্রভাব পড়ে ভুক্তভোগী পরিবারটির সন্তানদের ওপর। এ কারণে হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরকীয়া বহুমুখী একটি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে রোমান্টিসিজম, অর্থনীতি এবং অপরাধ অনেককিছু জড়িত। এক ধরনের সামাজিক যে বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে আমরা ধাবিত হচ্ছি সেখানে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে না বলে ধারণা করছি। সেখানে কাজের জায়গা থেকে পরিবারসহ যে প্রতিষ্ঠান আছে সবারই দায়বদ্ধতা আছে। এক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধের জায়গাতে আরও বেশি কাজ করতে হবে। আর তা না হলে এর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পড়ে যাবে।