প্রত্যেক মানুষ তার পরিবার-পরিজনকে ভালো রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। তাদের জীবনকে আনন্দদায়ক করতে কত ত্যাগ করে। জীবনের মূল্যবান সময়, সম্পদ সব ব্যয় করে মানুষ তার প্রিয়জনদের একটি সুখী ও নিরাপদ জীবন উপহার দিতে চায়। মানুষ তার প্রিয়জনদের দুনিয়ার শান্তি ও সফলতার জন্য যেমন চিন্তিত হয়, গুরুত্ব দেয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত তাদের আখিরাতের জীবনের নিরাপত্তাকে।
কারণ দুনিয়ার জীবনের চেয়ে আখিরাতের জীবন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব তার ও তার পরিবারের আখিরাতের জীবন সাজাতে সচেষ্ট হওয়া। এমন কোনো কাজে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ না দেওয়া, যা তাদের পরকালকে ধ্বংস করে দেয়, তাদের জাহান্নামের উপযুক্ত করে তোলে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা তোমাদের নিজেদের আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাবের ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদের যা করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
অর্থাৎ কোনো কিছু দিয়েই সেই ফেরেশতাদের থামানো সম্ভব হবে না; যতক্ষণ আল্লাহর নির্দেশ না হবে।
যদি কেউ সে কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে ও পরিবার-পরিজনদের বাঁচাতে চায়, তাহলে তাদের উচিত একমাত্র মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে নিজেদের পরিচালিত করা। আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেদের বিরত রাখা। পরিবার-পরিজনের মায়ায় পড়ে তাদের আল্লাহর নাফরমানিতে সহযোগিতা না করা। কারণ দুনিয়াতে পরিবার-পরিজনের মন রাখতে গিয়ে তাদের অন্যায় আবদার রক্ষা করা, গুনাহের সুযোগ দেওয়া এবং অর্থায়ন করা সাময়িকভাবে তাদের উপকার মনে হলেও বাস্তবে এগুলোর মাধ্যমে তাদের জাহান্নামে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর, যা একজন সুস্থ মস্তিষ্কের অভিভাবক কখনোই করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদের প্রবেশ করাব আগুনে। যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে তখনই আমি তাদের পাল্টে দেব অন্য চামড়া দিয়ে, যাতে তারা আস্বাদন করে আজাব। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৬)
এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে মুয়াজ (রা.) বলেছেন যে, তাদের শরীরের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন সেগুলো পাল্টে দেওয়া হবে এবং এ কাজটি এত দ্রুতগতিতে সম্পাদিত হবে যে এক মুহূর্তে শতবার চামড়া পাল্টানো যাবে। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘আগুন তাদের চামড়াকে এক দিনে সত্তর হাজারবার খাবে। যখন তাদের চামড়া খেয়ে ফেলবে, সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোককে বলা হবে, তোমরা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাও। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পূর্বের মতো হয়ে যাবে।’ (ইবনে কাসির : ১/৫১৪)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদের ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেবে?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ১৫)
জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি কতটা ভয়ংকর হবে, তার বর্ণনা পবিত্র হাদিস শরিফে পাওয়া যায়। নোমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তিকে জাহান্নামিদের মধ্যে সবচেয়ে কম শাস্তি প্রদান করা হবে, তার পায়ের তালুর নিচে দুটি জ্বলন্ত অঙ্গার রাখা হবে। তাতে তার মগজ পর্যন্ত টগবগ করে ফুটতে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬০৪)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন এবং প্রিয়জনদের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করুন। আমরা যদি সত্যিই আমাদের পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসি, তবে আমাদের উচিত সব ধরনের গুনাহ ও অনৈতিক কাজ থেকে তাদের বিরত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। নিজেরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির ওপর দায়িত্বশীল; সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোনো ব্যক্তির দাস স্বীয় মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, জেনে রাখো, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮)
মহান আল্লাহ সবাইকে সতর্ক হওয়ার তাওফিক দান করুন।
বিডি প্রতিদিন/কেএ