দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশি নারীর তাক লাগানো সাফল্য এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ঈর্ষণীয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে, বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা সূচক, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, স্কুলে মেয়ে শিক্ষার হার, মজুরি পাওয়ার হারসহ আরও বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশের নারীরা পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছেন। কিছু সূচকে আবার দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নারীরা শীর্ষে আছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় অনেক সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে গেলেও নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বড় অর্জন এখনো করতে পারিনি। বিশেষ করে উচ্চদক্ষতার শ্রমবাজারে নারীরা ঢুকতেই পারছেন না, নারীর অংশগ্রহণ সেখানে আরও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে নারীর উপস্থিতি আগের চেয়ে বেড়েছে। ৯০-এর দশকে যেখানে দেশে কর্মসংস্থানে নারীর উপস্থিতির হার ছিল ২৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। আর ভারতে এখন নারীর কর্মসংস্থানের হার ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে পাকিস্তানের কর্মস্থানের দিক দিয়ে নারীর উপস্থিতির হার ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। মেয়ে ও নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার হারেও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। বাংলাদেশে ২০২১ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি মেয়ে শিক্ষার্র্থীদের শিক্ষার হার ছিল ৯৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একই সালে ভারতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার হার ছিল ৯১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর পাকিস্তানে ২০২২ সালে মেয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার হার ছিল ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক সূচকে দেখা যায়, বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশের অবস্থান। ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। নেপালের অবস্থান ১১৭তম, শ্রীলঙ্কা ১২২তম, ভুটান ১২৪তম, ভারত ১২৯তম, মালদ্বীপ ১৩২তম এবং পাকিস্তান ১৪৫তম।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ডব্লিউইএফের তথ্যে, রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়নে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে। ভারতের অবস্থান ৫১, পাকিস্তান ৯৮ এবং শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৯০। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের নতুন একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নারীদের পেশায় উন্নতির আকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ নারী সিনিয়র পদে পদোন্নতির জন্য আগ্রহী। নেপালে এ হার ৭৯ শতাংশ আর শ্রীলঙ্কায় ৭০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বিশেষ করে কৃষিজনিত মজুরিবিহীন কাজে এ অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী আগেও কাজ করত, এখন জরিপে আমরা তাদের কাজের স্বীকৃতি দিচ্ছি। ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় অনেক সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে গেলেও নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বড় অর্জন এখনো করতে পারিনি। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে তুলনা করলে প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত কাজে দেশের নারীনা বেশি দূর যাননি। সামাজিক কারণে শিক্ষিত নারীদের অনেকে শ্রমবাজারে অংশ নিতে চান না। অল্পসংখ্যক উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও ধনীর পরিবারের শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রে এমন হয়। তারা ঘরে থেকে সন্তান প্রতিপালন ও সংসারের কাজে বেশি আগ্রহী। তবে এটা সার্বিকভাবে বলা যাবে না যে, সুযোগ থাকার পরও নারী প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজে অনাগ্রহী এবং সন্তান প্রতিপালনে বেশি আগ্রহী। আবার কর্মক্ষেত্রে শিশুদের ডে-কেয়ারের মতো সুবিধা না থাকার কারণেও নারীদের কাজে আগ্রহ কম।