বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে উন্নত চিকিৎসার্থে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কাতারের আমিরের বিশেষ উপহার রয়েল কাতার আমারি বিশেষায়িত ‘এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’ যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। তাঁকে বহনকারী বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় আজ বুধবার সকাল ১০টায় হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। বিমানবন্দরে তাঁকে ভিআইপি প্রটোকল প্রদান করবে হিথ্রো কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরে বেগম জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাবেন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমানসহ পরিবারের সদস্য ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী। অর্ধযুগেরও বেশি সময় পর দেখা হবে মা ও ছেলের। যুক্তরাজ্যে পৌঁছে হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সরাসরি পশ্চিম লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল (অ্যাডভান্স হেলথকেয়ার সেন্টার) ‘লন্ডন ক্লিনিক’-এ নেওয়া হবে এবং সেখানেই তাঁর চিকিৎসা শুরু হবে। যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ৮০ বছর বয়সি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন।
এর আগে রাত সোয়া ৮টার দিকে খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে ক্রিম কালারের একটি গাড়িতে করে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন। গাড়িতে তাঁর পাশে ছিলেন ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান (সিঁথি)। গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, প্রয়াত ভাই সাঈদ এস্কান্দারের সহধর্মিণী নাসরিন এস্কান্দার, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতারা ও আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে বিদায় জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে জড়ো হন হাজারো নেতা-কর্মী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাসভবন থেকে রওনা হওয়ার পর সেখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যাডাম বাসা থেকে রওনা হয়েছেন। তিনি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীসহ সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।’
বাসা থেকে বেরিয়ে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় পর রাত ১১টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছান বিএনপি নেত্রী। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানবন্দর থেকে কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ১১টা ৪৬ মিনিটে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সোমবারই ঢাকায় এসেছে, সেটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টারমাকে রাখা হয়েছিল।
বিমানবন্দরে দলের সিনিয়র নেতারা খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান। দলের চেয়ারপাসনকে বিদায় জানাতে বিকাল থেকেই বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী। বিদায় জানানোর সময় জনদুর্ভোগ এড়াতে ঢাকা মহানগরী বিএনপি ও এর সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আগেই বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতেও দুর্ভোগ পুরোপুরি এড়ানো যায়নি। গুলশান থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তার এক পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আশা করছি সুচিকিৎসা করে খালেদা জিয়া আবার দেশের মানুষের কাছে ফিরে আসবেন। যাওয়ার সময় তিনি আবারও বলেছেন যে আপনি বলবেন- দেশবাসী যেন আমার জন্য দেয়া করেন। আমিও আল্লাহ’র কাছে চাই দেশ ও দেশবাসীকে যেন আল্লাহ ভালো রাখেন। দলের চেয়ারপারসনকে বিদায় জানিয়ে বিমানবন্দরে এসব কথা বলেন তিনি। সাত বছর পর লন্ডনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেখা হবে। লন্ডনে পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও নাতনি জায়মা রহমান খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মা-ছেলের দীর্ঘ কাক্সিক্ষত এ সাক্ষাতে দেশ, দল ছাড়াও ভবিষ্যতের রাজনীতি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হতে পারে। উল্লেখ্য বিএনপি চেয়ারপারসন সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন। এরপর তাঁর আর কোনো বিদেশ সফর হয়নি।
তাঁকে বহনকারী কাতার আমিরের বিশেষ বিমান ‘রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’টি সোমবার ঢাকায় পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার কথা জেনে তাঁর রাজকীয় বহরের এই বিশেষ বিমান দিয়েছেন।
ঢাকা থেকে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের ছয়জন সদস্য যথাক্রমে অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার, অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক, অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদ, ডা. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও ডা. মোহাম্মদ আল মামুন তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। এ ছাড়া বেগম জিয়ার সঙ্গে তাঁর ছোট ছেলের স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ ব্যক্তিগত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। ডা. জাহিদ হোসেন সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার নানা শারীরিক জটিলতা রয়েছে। তাঁর লিভার সিরোসিসের জটিলতা নিরসনে কিছু চিকিৎসা দেশে হয়েছে। আরও অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁর হার্টে একাধিক ব্লক ছিল। জীবন বাঁচানোর জন্য যেটুকু চিকিৎসা দরকার, সেটুকু করা হয়েছিল ওই সময়ে। কারণ ওই সময়ে তাঁর শারীরিক সুস্থতা সে রকম ছিল না। তাঁর আরও যে ব্লক আছে, সেগুলোর চিকিৎসা করার দরকার। জটিল যে রোগগুলো আছে, সেগুলোর যুগোপযোগী চিকিৎসা প্রয়োজন। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুরুতর অসুস্থ বেগম জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে ১৮ বার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু হাসিনা সরকার তাঁকে বিদেশে যেতে অনুমতি দেয়নি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়াকে সব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়।