প্রতিশোধস্পৃহাজনিত উন্মত্ততায় ভোগা ব্যক্তিদের কাজকারবার দেখলে আমোদিত হন অনেকে। কেউ কেউ হন রুষ্ট। দুই কিসিমেরই অভিজ্ঞতা আছে আমার। ওই অভিজ্ঞতা অর্জনকালে আমি হই স্মৃতিকাতর। তখন কেবলই যাঁকে মনে পড়ে তিনি সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দিন (জন্ম : ১২ মার্চ-১৯১১, মৃত্যু : ২৪ আগস্ট ১৯৮৮)। তাঁকে আমরা তাঁর ভাষায় ‘চ্যাংড়া সাংবাদিকরা’- জাফর ভাই বলে সম্বোধন করতাম। দুনিয়ায় অল্প যে কজনকে অতি উচ্চমানের মানুষ বলে মানি তাঁদের একজন এই আবু জাফর শামসুদ্দিন।
‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ শিরোনামে দৈনিক সংবাদ-এ কলাম লিখতেন একুশে পদকজয়ী (১৯৮৩) আবু জাফর শামসুদ্দিন। ‘অল্পদর্শী’ ছদ্মনামে লিখতেন। সংবাদ-এ কাজ করতাম বলেই বিরাট মাপের এই মানুষটির সঙ্গে মাঝেমধ্যে ভাববিনিময়ের সুযোগ পাই। তাঁর লেখা ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বাংলা সাহিত্যের অনন্য গ্রন্থ। তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি ও জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর স্নেহছায়া পেয়ে আমরা গর্বিত।
রাজধানীর রাজারবাগে আবু জাফর শামসুদ্দিনের মাঝারি মানের বাসভবন। পাশে আরেকটি ছোট্ট বাসা, এটা তিনি সংসার খরচের ক্ষেত্রে বরকত হবে, এই আশায় ভাড়া দিতেন। আমার অনুরোধে তিনি ফাহিম নামে সদাগরি অফিসের এক তরুণ কর্মকর্তাকে ওই বাসায় সপরিবার থাকতে দেন। তাঁকে ‘চাচা’ ডাকতেন ফাহিম। ফাহিমের জাফর চাচা প্রায় প্রতিদিনই রান্না করা খাবার পাঠাতেন চার সদস্যের ফাহিম পরিবারের জন্য। ফাহিমের ধারণা, বাড়িঅলা প্রতি মাসে ভাড়াটেদের ন্যূনপক্ষে সাড়ে তিন কী চার হাজার টাকার খাবার বিনি পয়সায় খাওয়ানোর ব্যবস্থা জারি রেখেছেন। বছরখানেক পরে প্রমোশন পেয়ে ম্যানেজার পদে উঠলেন ফাহিম। তখন ফাহিম আরও উন্নত মানের বাসায় ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। তাই বাসাটি ছেড়ে দেন। ‘আগামী মাস থেকে থাকব না’ নোটিস দিতে গেলে জাফর ভাই বলেন, ‘দুই হাজার টাকায় তোমার বোধ হয় পোষাচ্ছে না। বহু বছর চাকরি করেছি। চাকরিজীবনের কষ্ট আমি বুঝি। সামনের মাস থেকে তুমি দেড় হাজার টাকা করেই দিও।’
পাকিস্তান জমানায় জাফর ভাই ও তাঁর কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। সে দেশের সরকারের মেহমান তাঁরা। তাপানুকূল মিনিবাসের আরোহী হয়ে তাঁরা নানা শহর পরিদর্শন করার পর্যায়ে কান্দাহার শহরে ঢুকছেন। একদা মাদরাসায় পড়া আবু জাফর শামসুদ্দিন পশতু ভাষায় লেখা শব্দাবলি মোটামুটি বুঝতেন। তিনি দেখলেন, রাস্তার দুধারে সুন্দর সুন্দর বাড়ি। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে বাহারি ফুল বাগান। ওই বাগানগুলোর মধ্যেই পারিবারিক গোরস্তান। কবরের উত্তর দেয়ালটা বেশ উঁচু। সেখানে যাকে গোর দেওয়া হয়েছে তার নাম লেখা। নামের নিচেই পশতু ভাষায় কী কী যেন লেখা। এই লেখার পর আরেকটা নাম। এরপর কী কী লেখা। এভাবে নাম আর কী কী লেখা আছে পাঁচবার।
‘বুজছনি! আমি মনে করলাম এক কবরে পাঁচজনকে দাফন করা হয়েছে’ বলেন জাফর ভাই, ‘গাইডকে বলি, তোমাদের বিশাল দেশ। মানুষ কম। দাফনের বেলায় জমি নিয়া কনজুসিকরণের দরকার হইল ক্যান?’ জবাবে গাইড যা বললেন তাতে জাফর ভাই হতভম্ব হয়ে গেলেন। গাইড জানালেন, কবরে একজনই শায়িত। তার নাম প্রথমে লেখা রয়েছে।
এরপরই লেখা আছে ঘাতকের নাম। মানে যার গুলিবর্ষণে বা ছুরিকাঘাতে মৃত্যুটি ঘটেছে তার নাম। ঘাতকের নামের পরে রয়েছে ঘাতকের বাবার নাম। এরপর ঘাতকের ভাইয়ের নাম। এরপর রয়েছে ঘাতকের ছেলের নাম। এরপর ঘাতকের নাতির নাম। এতজনের নাম লেখার উদ্দেশ্য কী? জানতে চাইলেন আবু জাফর শামসুদ্দিন। গাইড বলেন, ‘হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের সুবিধার্থে নাম-পরিচয় দেওয়া আর কী। ঘাতকের রক্ত-সম্পর্কীয় যে কোনো একজনকে খতম করে দিতে পারলেই হাসিল হয়ে যাবে মনজিলে মকসুদ, মানে প্রতিশোধ। জাফর ভাই বলেন, ‘যাকে ঘাতক মনে করে এত পরিকল্পনা সে-ই যে প্রকৃত ঘাতক সেটা নির্ণয় করার পদ্ধতি কী?’ গাইড বলেন, ‘পদ্ধতির নাম বিশ্বাস। যার নিকটজন হত্যার শিকার হলো, সে হত্যা ঘটনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে এবং একটা বিশ্বাস ধারণ করে যে অমুকই খুনটা করেছে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে একটা স্বপ্নের সংযোগ ঘটে দ্রুত। বিশ্বাস ছাড়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব।’
‘বিশ্লেষণ তো ভুলও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্দোষ ব্যক্তির জীবন যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।’ যুক্তি দেখালেন আবু জাফর শামসুদ্দিন, ‘পুলিশি তদন্তের পর হত্যা মামলা রুজু করার ব্যবস্থা কি এদেশে নেই? গাইড বলেন, ‘অবশ্যই আছে। ওটা তো বাদশাহি এন্তেজাম। মামলা হবে। বিচার হবে। রায় হবে। মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকর করতে বাদশাহর অনুমোদন লাগবে। দীর্ঘ ইন্তেজারের ব্যাপার! অত ঝামেলায় কার পোষায়?’
আমরা সমস্বরে বলি, বিশ্বাস আর স্বপ্নের আলিঙ্গন তো দেখছি ভেরি ডেঞ্জারাস!
২. প্রতিশোধস্পৃহাজনিত উন্মত্ততায় ভোগা এক ব্যক্তি দূরপাল্লার বাসে আমার সহযাত্রী হয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে বাড়ি যাচ্ছিলাম। সালামত আলী বসেছেন আমার বাঁয়ে। বাস ছুটছে ফেনী শহরের দিকে। সংবাদপত্র পড়ছি। চল্লিশোর্ধ সালামত আলী গায়ে পড়ে আলাপ জমানোয় সচেষ্ট। বললেন, ‘স্টুডেন? নাকি সার্ভিস? (ছাত্র, নাকি চাকুরে)’
বিনোদন সূত্র পাওয়ায় সংবাদপঠনে ক্ষান্ত দিলাম। বললাম, ‘সার্ভিস’। সালামত বলেন, ‘মাশাল্লাহ। বুঝাই যায় না সার্ভিস করেন। তো কোন ডিফাটে সার্ভিস করেন। বেতন কত? বেতনের অঙ্ক শুনে বলেন, ‘ফাইন! ফাইন! ম্যারিজ (বিয়ে) কইচ্ছেননি?’ তাঁকে জানাই যে বিয়ে করা হয়নি। সালামত বিস্মিত হন, ‘কন কী! সার্ভিস করেন অথচ ম্যারিজ করেন নাই, থান ক্যামনে? (থাকেন কীভাবে)’
আপনি ম্যারিজ করেছেন? প্রশ্ন শুনে সালামত আলী হাহ্ হা হোহ্ হাসতে হাসতে বলেন, ‘টু সান, ওয়ান ডটারের ফাদাররে কইলেন ম্যারিজ কইরছনি, আপনি ভাইজান, দারুণ রহস্য করতে পারেন।’
শুধু সালামত নন, অনেক শিক্ষিতজনকেও দেখেছি, তারা ‘রসিকতা করা’ না বলে, বলেন ‘রহস্য করা’। রসিকতা আর রহস্যর মধ্যকার পার্থক্য বুঝিয়ে বলি সালামতকে। সালামত বলেন, ‘ক্লাস এইট পইজ্জন্ত পইড়ছি। সব শব্দের ইন্টারেস্টিং বুজার পাওয়ার তো কম হবেই। তো আল্লার কাছে শোকর। এইট পাস আমারে মাবুদ দিছেন আদমসির মতো মিলের ফোরম্যানের পোস্ট।’
‘আদমসি’ মানে আদমজী জুট মিল। এই ফোরম্যান যে ভায়রার বাড়িতে ফায়ার-লাগানো-ম্যান সেটা জানা গেল মিনিট দশেকের মধ্যে। বাস তখন ফেনী শহর ছেড়ে পশ্চিমমুখো ছুটছিল। সালামত আলী জানান, তাঁর এসএসসি পাস শালি বিজলী বেগমের সঙ্গে বিকম পাস ব্যাংক অফিসার আকমল হোসেনের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে তাঁর কদর কমতে কমতে একেবারে জিরো হয়ে গেছে। ভায়রাকে পাঁচ কাঠা জমি উপহার দিয়েছেন শ্বশুর। সালামতকেও পাঁচ কাঠা দেওয়া হয়েছিল, ওটা তিনি বেচে দিয়েছেন। শ্বশুর প্রদত্ত জমিতে আকমল নিজের জন্য এল টাইপের চমৎকার একটা ঘর তুলেছেন।
সালামতের বিশ্বাস, ওই ঘরে ওঠার পর থেকে আকমল-বিজলী দম্পতির অহংকার আসমান ছুঁয়ে ফেলেছে। ফলত বিশ্বাসের সঙ্গে স্বপ্নের সংযোগ ঘটালেন সালামত। স্বপ্ন বাস্তবায়নও হয়ে গেছে। বিজলীর শিশুসন্তানের আকিকা অনুষ্ঠান হলো ধুমধামে। খেয়েদেয়ে মেহমানরা বিদায় নিতে নিতে রাত গভীর। বাড়ির লোকজন ঘুমিয়ে পড়তেই দাউ দাউ আগুন জ্বলে উঠল নতুন টিনের ঘরে। সালামত বলেন, ‘আড়াই টিঁয়ার (টাকার) কেরোসিন ত্যাল আর পঁচিশ পইসার ম্যাচবাত্তির একখান কাঠি ব্যবহার করলাম ভাইজান। ব্যস, ছাই হইয়া গেল সত্তর হাজার টিঁয়া খরচ করি বানানো রাজবাড়ি।’
সাফল্যের বর্ণনাকালে তৃপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সালামতের চেহারা। আমার আসনের সামনের আসনে বসা বিস্মিত দুই যাত্রী কুপিত হয়ে বলেন, ‘এই জানোয়াররে ধাক্কা মাইরা বাসের তুন ফেলি দেওয়া উচিত। আমার পেছনের আসনে বসা দুই যুবক হাঁক দেয়, ‘কন্ডাক্টর। বাস থামান।’ আমি সালামতকে বললাম, ‘চুপচাপ নেমে যান। নইলে এরা আপনাকে দুরমশ করবে।’ তখন আমার বয়স কম, সাহস বেশি। সমমনা চার যাত্রীর আবির্ভাবে শক্তিমান হয়ে গর্জে উঠি, ‘জলদি নামবি? নাকি লাথি খাওনের জন্য ওয়েট করছিস?’
৩. মালয়ালম ভাষার কাহিনিকার কামরু নীলকান্ত পিল্লাই তাঁর ‘উল্টাসিধা’ শীর্ষক গল্পে প্রতিশোধ গ্রহণ ব্যাকুলতায় ব্যাধিগ্রস্ত ধনপতি কনজু মেননের মর্মান্তিক পরিণতি বর্ণনা করেছেন। ‘উল্টাসিধা’ গল্পটি পড়তে পড়তে যা স্পষ্ট হয়, তা হলো : প্রতিপক্ষকে নাকাল করার বেলায় অতিচালাকের সফল কৌশল দেখে মুখ হাঁ হয়ে যায় আমাদের। তখন আমরা ভুলে যাই যে এরা নিজের দম আটকানোর জন্য নিজের গলায় দড়িও বাঁধে চমৎকার।
রাজনীতিক রাজ শিবশংকরের সঙ্গে ধনপতি কনজু মেননের বিরোধ পাকতে পাকতে এমন অবস্থায় এসেছে যে মওকামতো পেলে রাজকে কাবাব বানিয়ে খায় কনজু। সমস্যা হলো, কনজু যতই রাজকে বিড়াল বানাতে চায় রাজ ততই বাঘ হয়ে যায়। শেষতক কনজুর বিশ্বাস জন্মে যে রাজকে সপরিবার হাওয়া করে দেওয়াই মঙ্গল। স্বপ্নটা ছকে ফেলল কনজু মেনন। স্বপ্নটা হলো : গভীর রাতে পেশাদার খুনি ভইকম সদলে ঢুকবে রাজনীতিক রাজের বাড়িতে। রাজ, তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে আর গৃহপরিচারিকাকে জবাই করবে। ঘাতকের হাতে বাড়ির নম্বর দিয়ে বলা হয়, সাবধান! কুটিকরণ রোডের দুই ধারের সব বাড়িরই রং গোলাপি। তুমি উনিশ নম্বর বাড়িতে অপারেশন করবে। মনে রেখ, নাম্বার নাইনটিন।
চক্রান্ত অনুযায়ী অপারেশন চালানো হয়। অপারেশন সাকসেসফুল! হত্যা অভিযানের বিবরণ শোনার পর কনজু মেননের আর্তচিৎকার ‘হায় রে তোরা কী করলি! তোরা তো আমার বোনের বাড়ির সবাইকে খুন করে ফেললি।’ ঘাতকের হাতে দেওয়া হয়েছিল ইংরেজিতে লেখা উনিশ। যে কাগজে উনিশ লেখা ছিল, ঘাতকরা উল্টো করে ধরায় তা ইংরেজি একষট্টি হয়ে যায়। কনজু মেননের বোনের বাড়ি নম্বর ছিল একষট্টি।
লেখক : সাংবাদিক