মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর জারি করা নির্বাহী আদেশের প্রথম ধাক্কা লেগেছে দেশের স্বাস্থ্য খাতে। এরই মধ্যে সব প্রকল্প ও কর্মসূচি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউএসএআইডি। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণার পর শঙ্কা তৈরি হয়েছে কারিগরি সহায়তা নিয়েও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহায়তা বন্ধের ফলে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করার পাশাপাশি অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। গতকাল স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠনগুলোকে চলমান সব প্রকল্প ও কর্মসূচির ব্যয় বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেন ইউএসএআইডির বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক রিচার্ড অ্যারন। ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ : যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তার পুনর্মূল্যায়ন ও পুনঃসামঞ্জস্যকরণ’ শীর্ষক চিঠি?তে বলা হয়েছে, ইউএসএইড-বাংলাদেশের সব বাস্তবায়ন অংশীদারদের প্রতি নির্দেশিকা হিসেবে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। যাতে আপনার সংশ্লিষ্ট ইউএসএইড-বাংলাদেশ চুক্তি, কার্যাদেশ, অনুদান, সমন্বিত চুক্তি বা অন্যান্য অধিগ্রহণ বা সহায়তা সরঞ্জাম অধীনে করা কোনো কাজ অবিলম্বে বন্ধ, থামানো বা স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি চলমান কাজগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় সঞ্চয়ের জন্য যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ইউএসএইডের অর্থায়নে চলমান সব প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে নিশ্চিত করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য অধস্তনদের নির্দেশ নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, বিদ্যমান বা নতুন সহায়তার বিষয়গুলো পর্যালোচনা এবং অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী ৮৫ দিনের মধ্যে বিদেশি সহায়তার বিষয়গুলো রিভিউ করা হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতির অংশ এই উদ্যোগ।
ইউএসএআইডির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে সংস্থাটি। এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য কর্মসূচির পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্র ও সুশাসন, মৌলিক শিক্ষা এবং পরিবেশসংক্রান্ত কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এসব খাতে বাংলাদেশকে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে দেশটি। সর্বশেষ চার বছরেও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ৪৭০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ৪৯০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের পর এসব সহায়তা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২৫০ কোটি ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য সহায়তার পরিমাণ ২১০ কোটি ডলার। ইউএসএআইডি ছাড়াও পররাষ্ট্র, কৃষি, বিচার, জ্বালানিবিষয়ক দপ্তর এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে থাকে দেশটি। তবে ইউএসএআইডির প্রকল্প বন্ধ হওয়ার ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য মার্কিন সহায়তাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সরকারকে চিকিৎসা পণ্য, মেডিকেল কর্মী, রক্তদানসহ স্বাস্থ্য খাতে কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটিতে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই ডব্লিউএইচও থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্বাস্থ বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বিকল্প দাতা জোগাড় করতে হবে। না হলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য অনুদানের প্রতি নির্ভরতা কমিয়ে সাবলম্বী হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি? এ ছাড়া অনুদানের অর্থ যত্রতত্র অপচয় করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।