দেশের অন্যতম বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি। এ জেলায় রয়েছে ১০টি উপজেলা। এখানকার মানুষের চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় আছে একটি করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কাগজে কলমে সবকিছু থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চিকিৎসক, ওষুধসহ নানা সংকটে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে পাহাড়ের মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা বাঘাইছড়ি, বরকল, লংগদু, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি। এসব উপজেলায়ই রয়েছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকের পাশাপাশি রয়েছে ওষুধ, নার্স ও কর্মচারী সংকট। নেই রোগ শনাক্ত করার যন্ত্রপাতি। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নেই তেমন কোনো উন্নত চিকিৎসা সুবিধা। তাই প্রায় সময় রোগীশূন্য থাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। অন্যদিকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে রোগীর ভিড় এত বেশি থাকে যে সেবা দিতে চরম বেগ পেতে হয় চিকিৎসকদের। হাসপাতালটি ৫০ শয্যার ভবন। এতে রোগী ধারণক্ষমতা ১০০ শয্যার। কিন্তু প্রতিদিন রোগী ভর্তি হয় ১৫০ থেকে ২০০ জন। সংকট রয়েছে চিকিৎসক, নার্সসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সঙ্গে রয়েছে নানা হয়রানি। প্রতিবাদ করলে চিকিৎসা না দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হয় ছাড়পত্র। না হয় পাঠিয়ে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
স্থানীয় নাসরিন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, শ্বাসকষ্ট ও জন্ডিস হওয়ায় দুই দিনের নবজাতককে এ হাসপাতালে ভর্তি করেন তিনি। অক্সিজেন দেওয়ার জন্য নার্সকে ডাকতে গেলে অশোভন আচরণ করেন নার্স। পরে তার সন্তানকে চিকিৎসা না দিয়ে ছাড়পত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়।
শিরিন আক্তার বলেন, আমার এক বছরের বাচ্চা সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হলে হাসপাতালে ভর্তি করাই। দুই দিন চিকিৎসা হয় এ হাসপাতালে। কিন্তু ছাড়পত্র দেওয়ার সময় বয়ষ্ক মানুষের ওষুধ লিখে দেন চিকিৎসক। যা একটি শিশুর জন্য খুবই মারাত্মক। স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের পরিদর্শন ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা গেলে জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে আসবে। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের শুদ্ধাচারের প্রয়োজনও রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে ১৭৭ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ৮২টি। ২৩২ নার্সের বিপরীতে শূন্য পদ ১৫৬। ৮৬ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিপরীতে শূন্য পদ ৩২। ৩৬ উপসহকারী কমিউনিটি ও মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে শূন্য পদ ৩০। ৮ স্বাস্থ্য পরিদর্শকের বিপরীতে শূন্য পদ ৫। ২৩ সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের বিপরীতে শূন্য পদ ১৪। ১৫৫ স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে শূন্য পদ ৩০। ১৩৪ সিএইচসিপির বিপরীতে শূন্য পদ ২২। ২২০ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীর বিপরীতে শূন্য পদ ১৭৬।
হাসপাতালের আরএমও ডা. মো. সওকত আকবর বলেন, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালটি ৫০ শয্যার ভবন। রোগী রাখার ক্ষমতা ১০০ শয্যার। চিকিৎসক থাকার কথা ৩১ জন। আছে ২২ জন। বাকি পদ শূন্য। তিনি বলেন, হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য। যার কারণে বড় কোনো অপারেশন এখানে করা যায় না। বিশেষ করে সিনিয়র কনসালট্যান্ট, টেকনোলজিস্ট, গাইনি, ইএনটি কনসালট্যান্ট না থাকায় বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্তি রোগী ভর্তি হলে অতিরিক্ত শয্যা, ওষুধ ও খাবার প্রয়োজন হয়। অনেক সময় রোগীদের মেঝেতেও জায়গা হয় না। তার মধ্যে নেই পর্যাপ্ত কর্মচারী। সবমিলে নানা সংকট লেগে থাকে। রাঙামাটি জেলা সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা বলেন, চিকিৎসক সংকট যেমন আছে। তেমনি কর্মচারী সংকট রয়েছে। ৯টি উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, যন্ত্রপাতি ওষুধ প্রয়োজন। আমাদের ১৭৭ চিকিৎসকের মধ্যে ৯৫ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে পাঁচজন অনুপস্থিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন করে চিকিৎসক থাকার কথা, আছে মাত্র দুজন। এ ছাড়া সাব সেন্টারে চিকিৎসক নেই। সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।